বিক্রয় ডট কম এবং এখানেই ডট কম এর প্রতারনা থেকে সাবধান

বিক্রয় ডট কম এবং এখানেই ডট কম এর প্রতারনা থেকে সাবধান
দেশের জনপ্রীয় পন্য বিক্রি মাধ্যম বিক্রয় ডট কম এবং এখানেই ডট কম। এখানে যেমন চলছে বেচা বিক্রির হরদমাদম তেমনি চলছে বড় ধরনের চিটারী এবং বাটপারি। আমি নিজে ভুক্তভুগি। গত কাল আমি একটা মোবাইল ফোন কেনার জন্য এখানেই ডট কম এ ডুকলাম এবং এখানেই ডট কম থেকে সেট কেনার জন্য একটা টিউন সিলেক্ট করলাম। এবং কনপার্মও হলাম যে, সেট ঠিক আছে কিন্তু যখন ওই ছেলে আমাকে সেট পাঠাবে তখন আমি এস এ পরিবহনে যোগাযোগ করি। তাদের সহায়তায় আমি পরে জানতে পারলাম যে, আমাকে যে মোবাইল ফোন পাঠাবে সেটা আমি যে মোবাইল চাইছি সে মোবাইল নয়।  পরে আমি আর সেই সেট রিসিভ করিনা। তারপর আজ সকাল বেলায় বিক্রয় ডট কম থেকে একটা মোবাইল সিলেক্ট করলাম সবার দেখার জন্য লিংটাও দিলাম।
http://bikroy.com/en/ad/symphony-p6-original-for-sale-sylhet-63
এই ছেলে আমাকে সব  বলে কয়ে কুরিয়ার সার্ভিস বাবদ বিকাশের মাধ্যমে ২৮৫ টাকা নিয়েছে
ছেলেটির মোবাইল নাম্বার হলোঃ 01833297500 এই নাম্বার। ছেলেটি টাকা নেওয়ার পর আর আমার ফোন রিসিভ করছেনা এবং পরে মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে।

আপনাদের সবার কাছে আমার আকুল আবেদন বা অনুরোধ যে, কেউ কোন ভাবেই বিক্রয় ডট কম বা এখানেই ডট কম থেকে পন্য কিনতে সরাসরি যোগাযোগ করে কিনবেন তা ছাড়া  এভাবে আমার মত আর কেউ ভুল করবেন না।
আর এই ছেলেটির বাড়ি সিলেট। টেকটিউনসের সিলেটের কোন ইঞ্জিনিয়ার ভাই যদি থাকেন তাহলে পারলে ছেলেটাকে উচিৎ শিক্ষা দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন যেকোন ভাবে।

ভিডিও শেয়ার হবে এখন সানগ্লাসের মাধ্যমে

ভিডিও শেয়ার হবে এখন সানগ্লাসের মাধ্যমে
সানগ্লাস সাধারনত রোদ, ধুলাবালি থেকে চোখকে বাঁচানোর একটি মাধ্যম। তবে এখন শুধু চোখ প্রটেকশনের মধ্যে নেই সানগ্লাস।এখন ফ্যাশনের অন্যতম একটি সামগ্রী হচ্ছে সানস্লাস।বিভিন্ন ডিজাইনের, কালারের সানগ্লাস আসছে বাজারে। সেই ধারাবাহিকতায় বাজারে আসছে নতুন ধরনের সানগ্লাস। তবে এই সানগ্লাস এ রয়েছে কিছুটা ভিন্নতা। এই সানগ্লাসের মাধ্যমে ভিডিও শেয়ার করা যাবে। এমনই এক ধরনের সানগ্লাস বাজারে নিয়ে আসছে স্ন্যাপচ্যাট। স্ন্যাপচ্যাট একটি ম্যাসেজিং অ্যাপ কোম্পানি।
স্ন্যাপচ্যাট এই অত্যাধুনিক সানগ্লাসের নাম দিয়েছে স্পেকট্যাকলস। এর সানগ্লাসের মাধ্যমে ভিডিও শেয়ার করা যাবে।
এই সানগ্লাসটিতে একটি ছোট ক্যামেরা বসানো আছে। এই ক্যামেরাটিতে লেন্সের কোন হচ্ছে ১১৫ ডিগ্রী। লেন্সের জন্য এই সানগ্লাসের ক্যামেরা দিয়ে ধারন করা ভিডিও দেখলে মনে হবে যেন মানুষের চোখ দিয়ে দেখা দৃশ্য দেখছেন আপনি।
এই সানগ্লাস দিয়ে ধারন করা ভিডিওটি সরাসরি স্ন্যাপচ্যাট এ চলে আসবে। এবং এর মাধ্যমে সেখান থেকেই স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারকারীদের সাথে ভিডিওটি শেয়ার করা যাবে।
এই সানগ্লাসের ক্যামেরার সাহায্যে ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত ভিডিও একবারে রেকর্ড করা যাবে। স্পেকট্যাকলস নামের এই ম্যাসেজিং অ্যাপ সহ সানগ্লাসটির দাম হবে ১৩০ ডলার। এই বছরের মধ্যেই সানগ্লাসটির বাজারে আসার কথা রয়েছে। সানগ্লাসের মধ্যে ম্যাসেজিং অ্যাপ ছাড়ার সাথে সাথেই এই স্ন্যাপচ্যাট কোম্পানি তার কোম্পানির নাম বদলে ফেলেছে। আর নাম পরিবর্তনের কারন হচ্ছে এই অ্যাপটি এখন আর শুধু ম্যাসেজিং অ্যাপ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এর সাথে ভিডিও শেয়ার যোগ হয়েছে। তাই এখন এই কোম্পানির নাম শুধু স্ন্যাপ।

ডাউনলোড করে নিন Oxford Pocket Dictionary

ডাউনলোড  করে নিন Oxford Pocket Dictionary
আজ আমি আপনাদের একটা সফটওয়্যার এর লিঙ্ক দেব। সফটওয়্যারটির নাম Oxford Pocket Dictionary। এটি খুব ছোট সাইজ এর কিন্তু খুব এ ভাল মানের সফটওয়্যার।সবচেয়ে বড় কথা হলো Oxford Pocket Dictionary টির একটি বিশেষ গুন আছে। আপনি যখন কোন শব্দ খুজবেন তখন তার meaning আসবে এবং সেই meaning এর কোন শব্দ যদি আপনি না জানেন তাহলে এই শব্দের উপর click করলেই তার meaning চলে আসবে। আপানাকে আর আলাদা করে ওই শব্দের meaning টাইপ করে খুজতে হবে না।
ডউনলোড লিংকের জন্য এখানে ক্লিক করুনঃ"Oxford Pocket Dictionary"

নষ্ট মেমোরি কার্ড ঠিক করুন একদম সহজ উপায়ে

নষ্ট  মেমোরি কার্ড ঠিক করুন একদম সহজ উপায়ে
প্রজুক্তির সাথে থাকতে ভাল লাগে।
আজ আবার আপনাদের সামনে একটি অ্যাপ নিয়ে আসেছি। আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে।
ভালো লাগলে টিউমেন্ট করবেন। তো আর কথা না বারিয়ে শুরু করা যাক।

নষ্ট মেমোরি কার্ড ঠিক করুন আমাদের অনেকের ই মেমোরি কার্ড নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু আমরা মেমোরি গুলো ঠিক না করে বাইরে ফেলে দিচ্ছি কখনও হয়ত ঠিক করার চেষ্টা ও করি নি।

 তাই আমি আজ আপনাদের একটা সফটওয়্যার নিয়ে এসেছি যেটি ব্যবহার করে নষ্ট মেমোরি কার্ড ঠিক করতে পারবেন।
প্রথমে সফটওয়্যার টি ডাউনলোড করে নিন।

Download link: click here


এবার সেটআপ দিন। তারপর আপনার নষ্ট মেমোরি ঢুকান এবার সফটওয়্যার
→টি OPEN করুন তারপর আপনার মেমোরি সিলেক্ট করুন তারপর NTFS সিলেক্ট করুন Quick Format সিলেক্ট করুন THEN Start
বাটনে ক্লিক করুন। কিছু সময় অপেক্ষা করুন।ব্যাস কাজ শেষ।
অ্যাপটির সাইজ মাত্র 1.6mb। আশা করি কোন সমস্যা হবেনা।
কেউ কপি করবেন না। আমাদের অনেকের কপি করার অব্বভাস আছে। আর কপি করলে ক্রেডিট দিয়ে দিয়েন।
কেউ বাজে কথা বলবেন না। আশা করি।
তো আজ আর নয়। আজকের মত এ পর্যন্তই।
ভালো থাকবেন।

বিনামূল্যে যোগাযোগ করুন মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে

বিনামূল্যে যোগাযোগ করুন মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে
খুটিনাটি বিভিন্ন প্রয়োজনে আমাদের মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে কথা বলতে হয়।আমরা অনেক জানি না যে, সব কয়টি মোবাইল অপারেটরের রয়েছে একটি সাধারণ অভিযোগ ডায়েলিং নাম্বার।এই অভিযোগ ডায়েলিং নাম্বার এ গ্রাহকরা অভিযোগ করলে মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার থেকে নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে যোগাযোগ করা হয় গ্রাহকের সাথে।

(প্রিয় টেক) খুটিনাটি বিভিন্ন প্রয়োজনে আমাদের মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে কথা বলতে হয়।আমরা অনেক জানি না যে, সব কয়টি মোবাইল অপারেটরের রয়েছে একটি সাধারণ অভিযোগ ডায়েলিং নাম্বার।এই অভিযোগ ডায়েলিং নাম্বার এ গ্রাহকরা অভিযোগ করলে মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার থেকে নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে যোগাযোগ করা হয় গ্রাহকের সাথে।

যেভাবে অভিযোগ করবেন :

• প্রথমেই যে কোন অপারেটর থেকে ১৫৮ এ কল করুন।

• তারপর আপনার ভাষা নির্বাচন করুন।

•এবার আপনার যেকোনো একটি বিষয় এ অভিযোগ নির্বাচন করুন।

• অভিযোগ নির্বাচন করা শেষ হলে আপনার কাছে একটি মেসেজ আসবে এবং বলা হবে নিদিষ্ট (২৪ ঘণ্টা) সময়ের মধ্যে আপনার সাথে একজন কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি যোগাযোগ করবেন।

কাজেই ১৫৮ এ নাম্বার ডায়েল করে আপনি আপনার গ্রামীনফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেল থেকে অভিযোগ করে বিনামূল্যে কাস্টমার কেয়ারের সুবিধা নিতে পারবেন।

রেঞ্জার আমার বন্ধু (আমার প্রথম সাইন্সফিকসন)

রেঞ্জার আমার বন্ধু (আমার প্রথম সাইন্সফিকসন)
জেল খানায় নিরবে বসে যখন আমি জামিনের অপেক্ষায় ছিলাম ঠিক তখন ই ওর সাথে আমার পরিচয়। ওর নামে রেঞ্জার।জেলখানার অন্য সব রোবটের তুলনায় ও আলাদা
কিছ দিন আগেও জেলখানাতে কোন রোবট ছিল না তবে এখন আছে । জেলখানার কয়েদিরা ড্রে,ন মলের টাঙ্ক পরিস্কার এগুলো করতে অসিস্কৃতি জানায় ।কতৃপক্ষ অবশ্য প্রথমে মেনে নিতে রাজি হয়নি ,ফলে কয়েদিরা স্ট্রাইক করে বসে গুলি ও চালানো হয় ।কয়েক জনের মৃতু্র পর দেশের অন্যতম বিজ্ঞানি ডঃ এডওয়াড এর সমাধানের জন্য কতৃপক্ষ এর নিকট আকটি প্রস্তাব দেন । তিনি বলেন কতৃপক্ষ চাইলে তিনি কিছু রোবট তৈরী করে দিতে পারেন ,এই রোবট বানানোর কাজে আমিও ডঃ এড ওয়াডের সাথে কাজ করেছিলাম ।
তবে রেঞ্জার এই শ্রমিক রোবটের মধ্যে পরেনা।তাকে ডঃ রেঞ্জার তৈরী করেছিলেন ।এর বৈশিষ্ট্য হল ও মানুষের মস্তৃকে হাত দিলে মানুষ যা কল্পনা করত ওর বুকের লাইভ মনিটরে দেখা যেত।
আমাকে যে অপরাধে জেল খানায় পাঠানো হয়েছে তা আমি করিনি ।আমার স্টুডেণ্ট রিট্রন আমাকে জেলে পাঠানোর জন্য দায়ি । সে এখন দেশের সি আই ডি এর প্রধান।
আমার স্ত্রী রজনী আর ও দু জন ছিল আমার স্টুডেন্ট ।কিন্তু রজনীর সুন্দর ঠোট,চোখ কোমল ব্যবহার আমাকে প্রবল ভাবে আকৃষ্ট করেছিল বলেই আমি ওকে আমার মনের কথা জানায় ও রাজি হয়ে যায় ।তখন থেকেই রিট্রনের সাথে আমার দন্দ।ও রজনীকে খুব পছন্দ করত ।তবে সে কথা রজনী জানত না তাই, ওর কাছ থেকে আমাকে দুরে নিয়ে জাবার জন্যই আমার বিরধ্যে ওর রিপোট।
আমি আদালতে বারবার বলেছে স্যার আমি সরকারী তথ্য সম্বলিত যে website ওটা হ্যাক করিনি রিপোটে যে Ip ও Mac address দেওয়া আছে ওটা আমার নয় ।
তবে রেঞ্জারের জেলে আসার কারন আলদা আমি তাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম ,ও বলেছিল অনুমতি না নিয়েই একজনের মস্তিস্ক স্ক্যান করে তার প্রিয়জনের কিছু ছবি জনপ্রিয় social website এ publish করেছিলাম।
রেঞ্জারকে তৈরীর সময় ওর মধ্যে আবেগ তইরীর জন্য পোগ্রাম করা হয়েছে ।জেল কতৃপক্ষ কাছে রিকুয়েষ্ট করায় ওকে আমার কাছে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। আমি সময় কাটানোর জন্য ওর সাথে দাবা খেলতাম ।ওর মেমোরীতে গ্রান্ডমাস্তারের প্রোগ্রাম দেওয়া আছে ।ওর সাথে আমি হঠাত দু এক ম্যাচ জেতা ছাড়া বেশীর ভাগ ম্যাচেই হারতাম ,ওর সাথে থাকায় আমার জেলের জীবন টা কিছুটা হলেও ভাল কাটত ।আমি রজণীর সাথে মাঝে মাঝে লাইভ চ্যাত করতাম ওর সাথে দেখা হত সপ্তাহে দু এক বার ।আমাকে দেখতে এসে ও খুব কান্নাকাটি করত ।আমার খুব খারাপ লাগত ।আমার যখন খুব খারাপ লাগত আমি ওকে নিয়ে ভাবতাম তখন রেঙ্গার আমার মাথায় হাত রাখত আর আমি লাইভ মনিটরে ওকে দেখতাম।
রেঞ্জার আমার কষ্ট বুঝেছিল
বারিষ্টার রফিক্রন মারা যাবার পর ওনার ব্রেনের নিউরন থেকে প্রয়োজনীয় লজিক নিয়ে রফিক্রন নামে একটি বারিষ্টার রোবট তৈরী করা হয়েছিল।রেঞ্জারের সাথে ওর ভালো বন্ধুত্ত ছিল।
রেঙ্গার আমার কথা ওকে বলেছিল।রফিক্রন আমার হয়ে হাইকোটে আপিল করে ।রিট্রনের মুখোশ উন্মোচন হয়।
রিট্রনের ১০ বছর সাজা হয়েছে কারন কাজটা ওই করেছিল ।এক আমার সাথে প্রতারনা ,দুই ওয়েব সাইট হ্যাক।
আমি ও আমার ইস্ত্রী এখন ভালই আছি।আমাদের সন্তান মিথুন এখন বড় হচ্ছে ।ওর ফুটবল খেলার জন্য আমি ওকে ওর বয়সী একটি রোবট তৈরী করে দিয়েছি
রেঞ্জারকে আমি ভুলিনি ।সময় পেলেয় আমি ওর সাথে লাইভ চ্যাটিং করি এবং ওকে দেখতে যাই।
আর দুই মাস পর ওর মক্তি হবে ।ও আমার এখন খুব ভালো বন্ধু।

আমাদের প্রিয় ইঁদুরটির বয়স ৪৪ বছর :: মাউস সম্পর্কে বিস্তারিত!!!

আমাদের প্রিয় ইঁদুরটির বয়স ৪৪ বছর :: মাউস সম্পর্কে বিস্তারিত!!!
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। আসসালামুআলাইকুম । সবাইকে আমার আন্তরিক প্রীতি, সম্মান, শুভেচ্ছা ও ভালবাসা জ্ঞাপন করছি। আশাকরি আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে সবাই ভালো আছেন।
প্রশ্নঃ মানুষ কি নিজের চেহারা সরাসরি দেখতে পায়?
উত্তরঃ না। আয়না কিংবা ছবির সাহায্যে দেখতে হয়।
রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি মনে পড়ে গেলো-
“দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া,
ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া,
একটি ধানের শীশের উপর একটি শিশির বিন্দু”
ঠিক এমনি কম্পিউটার চালানোর সময় আমাদের ডান হাত দিয়ে আকড়ে ধরা মাউস সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না। একবার কল্পনা করুন তো কম্পিউটারে মাউস বিহীন একটি দিনের কথা। মাউসে আমরা অভ্যস্থের চেয়েও বেশী অভ্যস্থ। আসুন জেনে নেয়া যাক মাউসের ইতিহাস।

কেমন করে মাউস এলো


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্টানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৬৮ইং সালে একটি রিসার্চ টিমের বিশেষজ্ঞরা প্রথম প্রথম মাউস তৈরী করেন। তখন এটা ছিলো মূলত একটি এক্স ওয়াই পজিশন ডিভাইস। স্টানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৬৮ইং সালে একটি রিসার্চ টিমের বিশেষজ্ঞরা এমন একটি ইনপুট ডিভাইসের সন্ধানে ছিলেন- যা ট্রাকিং বল, লাইট প্যানেল বা জয়স্টিকের কাজ করতে সক্ষম হবে। কিন্তু দেখা গেলো মাউস তো এসব কাজ পারেই এবং ঐ সব ডিভাইসের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে।

মাউসের নামকরণ


আমরা জানি ইংরেজি মাউস (Mouse) অর্থ বড় ইঁদুর আর Rat অর্থ ছোট ইঁদুর। রিসার্চ টিমের বিশেষজ্ঞরা যখন মাউস নিয়ে কাজ করছিলেন তখন ঐ টিমের সদস্যদের কেই একজন মাউস দেখতে অনেকটা ইঁদুর সাদৃশ্য বলে মাউস নামকরণ করেন এই ভেবে যে পরবর্তিতে কোনো সুন্দর নাম দিয়ে বাজারে ছাড়া হবে। কিন্তু মাউস নামটাই পরিচিত হয়ে ওঠে আর ঐ ৫-৬জনের কে মাউস নামটি দিয়েছিলো তা আর জানানো হয় নি।

প্রথম মাউসটি দেখতে কেমন ছিলো


প্রথম মাউসটি তৈরি করা হয়েছিলো কাঠের ব্লকে চাকা লাগানো এবং এর উপর একটি লাল রঙের বাটন ও পিছনে তার জুড়ে দেয়া হয়েছিলো।

কখন ও কিভাবে মাউস বাজারে এলো ও জনপ্রিয় হলো


১৯৬৮ইং সালে মাউস আবিস্কার হবার পরে ১৯৭০ইং সালে কমার্সিয়াল ব্যবহারের জন্য এর নতুন রূপ দেয়া হয়। ১৯৮১ইং সালে সর্বপ্রথম মাউস বাজারে ছাড়া হয়। কিন্তু মাউস জনপ্রিয়তা অর্জন করতে ব্যার্থ হয় কারণ তখন পারসোনাল কম্পিউটারের প্রচলন ছিলো না বললেই চলে। ১৯৮৪ইং সালে আবারও মাউস বাজারে  বাজারে আসার পরে মাউস নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন পড়ে যায়। স্টিভ জবসের গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস ভিত্ত্বিক অপারেটিং সিস্টেম ম্যাক অপারেটিং সিস্টেমে মাউস অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আর বিল গেটসের উইন্ডোজ তো মাউস ছাড়া কল্পনাই করা যেতো না।
তাহলে দেখা যাচ্ছে বর্তমানে মাউস আবিস্কারের বয়স ৪৪ বছর হয়েছে। আর একটি মজার ব্যাপার হলো এখনও ১০০% মানুষ মাউস ব্যাবহার করে না করে আনুমানিক ৯২% ব্যবহারকারী।
কষ্ট করে আমার এই টিউনটি দেখার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি আপনাদের ভালবাসায় সিক্ত ও পরিতৃপ্ত। আপনাদের ব্যাপক সাড়া আমার নিত্যদিনের প্রেরণা।

এনালগ লোকের স্বাক্ষরিত একটি ডিজিটাল সনদপত্র!

এনালগ লোকের স্বাক্ষরিত একটি ডিজিটাল সনদপত্র!
মেহেরপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে গিয়েছিলাম। হঠাৎ কি মনে হল , দেখতে গেলাম যুব উন্নয়নের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সেখানে অফিসের কর্মকর্তার মাধ্যমে জানতে পারলাম মেহেরপুর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণের জন্য আছে ১১টি কম্পিউটার এর মধ্যে ৪টি নষ্ট। আর এবার জানুয়ারী-জুন ২০১২ মেয়াদী কোর্সের জন্য ভর্তি নেওয়া হয়েছে ৯০ জন প্রশিক্ষনার্থী। এক দিন পর পর ক্লাশ হবে ৭টি কম্পউটারে। এক পর্যায়ে আমি বললাম আপনার এখানে ভর্তি আছে অথচ আমার কাছে কম্পিউটার শেখার জন্য আমার ইনফরমেশন সেন্টারে আবার ভর্তি হচ্ছে কেন? তিনি উত্তরে জানালেন আসলে আমাদের এখানকার সনদপত্রের অনেক মূল্যায়ন তাই আমাদের কাছে ভর্তি হয় সনদপত্র নেওয়ার জন্য আর আপনাদের সনদপত্রের তো কোন মূল্যায়ন হয় না তাই আপনাদের কাছে ভর্তি হয় শেখার জন্য। তাইতো বলি আমাদের দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষকরা কেন যে কম্পিউটার অন করতে পারেন না। এসব কম্পিউটার শিক্ষকরা আবার ছাত্রদের সফটওয়ারের স্কু টাইট দেওয়া শেখাবে! আসলে এসব কম্পিউটার শিক্ষকরা নিজেরাই জানেন না সফটওয়্যারের স্কু থাকে কিনা। আমাদের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ করে গড়ে তুলবেন! তিনি তো আর মাঠ পর্যায়ের খবর রাখেন না। তবে হ্যা একটা জিনিস তিনি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন যে এসব কম্পিউটার শিক্ষকদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না তাই তাদের আরও ভালো ভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলতে আমাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাষ্টার ট্রেইনার হিসেবে। কিন্তু আবার সেই একই সমস্যা বেড়ায় ধান খেয়ে ফেললে কি আর হয়? আমাদের বাছাই করার আগে কত রকম পরীক্ষা দিতে হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত এর কার্যক্রম শুরু হলো না। আইসিটি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানব সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ইতিমধ্যে ১ বছর শেষ হয়েছে। অথচ কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। আমার মনে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ এসব এনালগ কর্মকর্তা দিয়ে চলবে না। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী বলছেন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়বেন আবার কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগের জন্য সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের ৬ মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ লাগবে। তাই মাননীয় প্রধান মন্ত্রী আগে সরকারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো থেকে এনালগ লোক সরিয়ে ডিজিটাল লোক দেন আর ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন তাহলে মাষ্টার ট্রেইনার নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন হবে না। আপনার মাষ্টাররাই বড় বড় ট্রেইনার হয়ে যাবে। আবার আমার পৌর তথ্য কেন্দ্রে ২২টি কম্পিউটারে দিয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে ক্লাশ নেওয়া হলেও আমার সনদপত্রের কোন দাম নেই। অন্যায় একটাই ভালো করে কম্পিউার শেখানো। ইউনিয়ন তথ্য এবং উপজেলা ই-সেন্টারগুলোতেও ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে কিন্তু এই সনদপত্রের মাধ্যমে শিক্ষক নিবন্ধন করতে পারবে না। কারণ শিক্ষক নিবন্ধন করতে কস্পিউটার জানার দরকার নেই দরকার শুধু এনালগ লোকের স্বাক্ষরিত একটি ডিজিটাল সনদপত্র। পরিশেষে আমরা বলতে পারি সরকারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো সনদপত্র বিক্রয়ের কাজে মাঠে নেমেছে। তাই মাননীয় প্রধান মন্ত্রী সমীপে আবেদন আমাদের যুব সমাজ সঠিক ভাবে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য মাঠ পর্যায়ে একটু খেয়াল রাখবেন। শুধু রাজধানী কেন্দ্রীক কোন অগ্রগতি দেখে খুশি হওয়ার অবকাশ নেই।

একটি লাশের আত্মকথা (১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স, বৃদ্ধ, দুর্বল মনের অধিকারী এবং যাদের হার্টের প্রবলেম আছে তারা প্লিজ পড়বেন না)

একটি লাশের আত্মকথা (১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স, বৃদ্ধ, দুর্বল মনের অধিকারী এবং যাদের হার্টের প্রবলেম আছে তারা প্লিজ পড়বেন না)
জীবনটা ভালোই কেটে যাচ্ছে। ২৭ বছরের জীবনে যে এত্ত কিছু একসাথে পেয়ে যাব তা আমি বা তন্বী কেউ ভাবিনি। ভাবছেন তন্বী কে? আমার বউ, আমার জীবন সাথী। পড়ালেখা যদিও খুব বেশি একটা করতে পারিনি। কারিগরী বোর্ডের আন্ডারে কম্পিউটারে ডিপ্লোমা করেছি। তাই কত....! ছোট্ট একটা পরীর মত মেয়ে হয়েছে আমাদের। নামটাও রেখেছি সেই রকম, “লিয়ানা ফাতিহা”। এই তো সেদিন জুনের ৬ তারিখে ছোট্ট একটা বাবু আল্লাহ্ আমাদের কে দুপুর ৩টার দিকে দিয়ে গেল। এখন সারাদিন ওকে দেখেই পার হয়ে যায় আমাদের দুজনের। প্রেমের বিয়ে আমাদের। অনেক বাধা-বিপত্তি পার করে আজ আমরা এক সাথে আছি। তাই এখনো দুজন দুজনাকে ছাড়া কিছু বুঝিনা। আমার বউ তো আমাকে প্রায়ই বলে, “আমাকে একা রেখে মরে গেলে কিন্তু খবর আছে!” শুনে হাসি...তা ছাড়া আর কি করব বলেন? মৃত্যু তো আর আমার হাতে নাই।
ছোট খাটো একটা ব্যবসা দাঁড় করিয়েছি আমি। টুক-টাক দিন চলে যায় আরকি। আমার বা তন্বীর কারোই সেরকম কোন উচ্চাশা নাই। আমরা যে একসাথে আছি এই আনন্দই ৫বছর ধরে শেষ করতে পারিনি! ২২বছর বয়সে বিয়ে করে কি বিপদেই না পড়েছিলাম! থানা-পুলিশ, পালানো, নির্ঘুম রাত কাটানো....বিশাল উত্তেজনাকর ঘটনা! সে কথা না হয় আর একদিন বলব। বর্তমানে স্ত্রী কন্যা নিয়ে ছোট্ট একটা দুই রুমের বাসায় বাংলাদেশে যতটুকু শান্তিতে থাকা যায় আছি আর কি। ধুর...যে কথা লিখতে বসলাম তা বাদ দিয়ে কি সব জীবন বৃত্তান্ত বলছি আপনাদের! কিছু মনে করবেন। আমি একটু বাচাল প্রকৃতির (আমার বউ এর মতে)!
আমার মেয়েটা খুব লক্ষী। ভাবছেন নিজের সন্তান বলে বলছি? না...না...আপনিও এসে দেখে যেতে পারেন। আজ তার বয়স ৩ মাস পূর্ণ হলো। আর এই ৩ মাসে সে কখনোই উচ্চস্বরে কান্না-কাটি, জেদ করেনি। শুধু প্রবলেম একটাই...আমার মত আমার মেয়েও ঘুমাতে চায় না! আমার বউ তো বলে যে পুরোই নাকি আমার মত হয়েছে...হাঃ হাঃ হাঃ! বউ আমার খুব লক্ষী....কখনই আমার কাছে কিছু চায় না! মাঝে মাঝে ভাবি মানুষ এইরকমও হয়! কিন্তু আসলেই এইরকম না হলে আমার মত ছোট-খাটো ব্যবসায়ী মানুষের কাছে মুষ্কিল হয়ে যেত! দেখেছেন....আবার গল্প ফেঁদে বসেছি! আপনারা মনে হয় অনেকেই লেখা শেষ না করেই চলে গেছেন, তাই না....গেলে যান...অনেকদিন পর ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে দুটো কথা বলার সুযোগ পেয়েছি...হেলায় হারাবো কেন?
সকালে প্রতিদিনের মতই বউ এর ডাকে বিরক্তি নিয়ে ঘুম ভাঙলো! ঘুম আমার খুব প্রিয়। উঠতে চাইছিলাম না...কিন্তু যখন বলল যে বাবুর দুধ শেষ হয়ে গেছে দুধ কিনতে হবে, তখন আর শুয়ে থাকতে পারলাম না। উঠে হাত-মুখ ধুয়ে শার্টটা গায়ে জড়িয়েই বেরিয়ে পড়লাম সাহেব বাজারের “বিস্কুট বিপণীর” উদ্দেশ্যে। মেয়ের আমার কপাল মন্দ! মায়ের দুধ পেটে সহ্য হয় না। ডাক্তার বলেছে ল্যাকট্রোজ না কি যেন নাম, ঐ টা বেশি। তাই কৌটার দুধ খাওয়াতে হচ্ছে। আর এদিকে এক প্যাকেট দুধ ৪দিনও যায়না ঠিকমতো! বলেন তো, আমি স্বল্প আয়ের মানুষ। আমার পক্ষে কি আর ৪০০/৫০০টাকা খরচ করে ৪দিন পর পর গুড়ো দুধ কেনা সম্ভব? তাই বলে আবার আমারে মেয়েটাকে কেউ ধমক দিয়ে বসবেন না যেন! আমার তো একটাই লক্ষী মেয়ে। করলাম না হয় একটু কষ্ট! বাসা থেকে না খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম। একটা রিকশাও পেয়ে গেলাম...রিকশাওয়ালার সাথে ভাড়া মিটিয়ে উঠে পড়লাম। দোকানে যেয়ে দেখি ৩৪৫টাকার দুধ ৩৯৫টাকা হয়ে গেছে! কেমন লাগে বলেন? আসলে আমরা যারা স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের এই দেশে বসবাস করা খুব কঠিন! দুধের প্যাকেট টা নিয়ে দ্রুত বাসায় যেতে হবে। বাবু আমার এতক্ষণে হয়তো ক্ষুধায় অস্থির হয়ে গেছে! সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টের এই চার মাথার মোড় টা সবসময় ব্যস্ত থাকে। তার উপর আবার যমের মত পুরো রাজশাহী ধরে ঘুরে বেড়ায় রাজশাহী ভার্সিটির বাস গুলো। আর ট্রাফিক আইন মানা তো দূরের কথা ভাংতেই যেন সবাই ব্যস্ত। যারা দেখেছেন তারা বুঝতে পারবেন। এখন তো সকাল...শহরে সবে ব্যস্ততার শুরু। রাস্তাটা পার হয়েই আবার রিকশা নিতে হবে....তারপর সোজা বাসা। ডানে-বামে তাকিয়ে রওনা হয়ে গেলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে চমকে উঠলাম! চারদিক অন্ধকার হয়ে উঠল! লোকজন চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, “আহ্হারে! মারা যাচ্ছে! মারা গেল!” আমি তো অবাক....! কে মারা গেল! এই মাত্রই তো সব দেখতে পাচ্ছিলাম! বাবার হাত ধরে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, কেউ ব্যস্ত ভাবে কাঁচা বাজারের ব্যাগ নিয়ে দৌড়াচ্ছে, কেউবা আবার অফিসমুখী....কিন্তু চোখের সামনে থেকে অন্ধকারটা সরছে না কেন? কি হলো? কে মারা যাচ্ছে? আজব তো! হ্যাঁ...এই তো এবার দেখতে পাচ্ছি! কিন্তু ঝাপসা! শরীরটা একবারে হালকা লাগছে। উঠে দাঁড়ালাম আমি। মনে হচ্ছে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছি! সব লোকজন দেখি এদিকে ভিড় করে আসছে। সবাই রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম হাতে দুধের প্যাকেট নাই! আমার দুধের প্যাকেট কই? দুধের প্যাকেট? এই যে ভাই...আমার বাবুর দুধের প্যাকেট টা দেখেছেন? ‘বায়োমিল-স’....এই মাত্র ৩৯৫ টাকা দিয়ে কিনেছি! ছোট্ট মেয়েটা আমার না খেয়ে বসে আছে! আমি দুধ নিয়ে গেলে তারপর খাবে! প্লিজ....কেউ দেখেছেন কি? আমার কাছে তো আর টাকাও নাই! ৫০০টাকার একটায় নোট ছিলো! এখন কি হবে! মাহফুজের কাছ থেকে আবার ধার নিবো? নাহ্.... তাহলে? আরে..ঐ তো বায়োমিল-সয়ের প্যাকেট টা পড়ে আছে....যাক বাবা...এত্ত ভিড়ের মধ্যেও প্ওয়া গেল! কিন্তু একি!!! প্যাকেটটা রক্তে সয়লাব হয়ে গেছে তো! আর পাশে ঐ রক্তাক্ত শরীরটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে!! শার্টটা তো আমারই!স্যান্ডেল ও আমার মত, যদিও আরেক পার্ট দেখতে পাচ্ছি না। ধুর...চোখের মাথা খেয়েছি মনে হয়! এটা তো আমারই শরীর! কেমন নিস্থর-রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে। মাথার উপর দিয়ে বাসের চাকাটা চলে গেছে! হলুদ হলুদ ঘিলু গুলো চারদিকে ছড়িয়ে গেছে! তাই চেহারাটা চিনতে পারছিলাম না। ও....তাহলে আমিই মারা গেছি! অদ্ভুত ব্যাপার! এতক্ষণ টেরই পায়নি! আসলে আগে কখনো মরে দেখিনি তো, তাই অনুভুতিটা জানা ছিলো না। এই ভার্সিটির বাসগুলো আসলেই যে কি!! এত লোকের ভেতর আমাকেই মারতে হবে? আর মারবি তো ভালো কথা আরেকদিন মারিস....আজ না বাবুর দুধ কিনতে এসেছি? এটা কি ঠিক হলো? এখন নিষ্পাপ বাচ্চাটা কি খাবে??
অবশ্য মরে গিয়ে খুব একটা খারাপ লাগছে না। শরীরটা পাখির পালকের মত হালকা হয়ে গেছে। কেমন যেন কুয়াশার ভেতর আছি আমি। সবাইকে দেখতে পাচ্ছি....আরে..আমি এগুলা কি ভাবছি? আমার তো বাসায় যেতে হবে।সর্বনাশ....অনেকক্ষণ হয়ে গেছে....এইসব অ্যাক্সিডেন্ট নিয়ে পড়ে থাকলে হবে? লিয়ানা আমার না খেতে পেয়ে হয়তো কাঁদছে। ওর মা তো মনে হয় বাসাতেই ঢুকতে দিবে না! কি যে আছে কপালে! যায় রওনা দিই....আজ হাঁটতে হাঁটতেই যেতে হবে মনে হচ্ছে! যে ভিড় বাজারে! লোকজন হুমড়ি খেয়ে আমার লাশটাকে দেখছে....কয়েকজন তো আবার ভাংচুর ও শুরু করে দিয়েছে। নাহ্...এখানে আর থাকা যাবে না। তন্বী শুনলে বকা দিবে। আর আমি তো এখন সন্তানের বাবা...এসবের ভেতর থাকতে নাই। হাঁটা ধরলাম বাড়ির দিকে....মজার ব্যাপার হলো কেউ আমাকে দেখতেই পাচ্ছে না! কিন্তু রাস্তার কুকুরগুলো কেমন করে যেন কুঁকড়িয়ে তাকিয়ে আছে। থাকুক...আমার থামলে চলবে না।
বাসার সামনেটা সেইরকমই আছে। লোকজন সব ব্যস্ত। এদিকে কেউ কিছু জানে না। বাসায় ঢুকতেই ভয় লাগছে। এই থেঁতলানো চেহারা দেখে তন্বী আর বাবু তো ভয় পেয়ে যাবে! তারপরও ঢুকে পড়লাম। আজ আর কলিং বেল টিপতে হল না। বউ আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে আছে। মেয়েটা মাঝে মাঝেই ক্ষুধায় কেঁদে উঠছে! আহারে! তন্বীর উদাস চেহারা আর মেয়ের কান্না শুনে আরেকবার মরে যেতে ইচ্ছা হল! ওরা এখনও খবর পায়নি মনে হয়। আমি মেয়েটার কাছে গেলাম, “এই যে মা! বাবা চলে আসছে। কিন্তু আজতো একটু কষ্ট করতে হবে। তোমার দুধের প্যাকেটটা রক্তে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। আরেক প্যাকেট কেনার মত টাকাও নেই আমার কাছে! সমস্যা নাই আজ আমরা সবাই না খেয়েই থাকবো, কেমন?” তন্বীকে কেমন যেন চিন্তিত দেখাচ্ছে! ও কি টের পেয়ে গেছে নাকি! না মনে হয়।
টিং টং...টিং টং....এই সময় আবার কে আসলো!
আচ্ছা, অর্ক....কি হলো আবার! ছেলেটাকে ভদ্রতা শেখাতেই পারলাম না! কতবার বলেছি কলিংবেল একবার টিপে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে। ও আসলে তো আমাকে ফোন দিয়ে আসে। ছেলেটা এভাবে হাঁপাচ্ছে কেন? ভাবি ভাবি বলে চিৎকার করছে কেন?
দাঁড়া...আজ তোর খবর আছে! শালা অর্ক! তন্বী দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল।
“ভাবি, ভাই বাজারে যেয়ে অসুস্থ হয়ে গেছে, হসপিটালে আছে..আপনি এখনি চলেন।” ওরে মিথ্যুক! আমি অসুস্থ না? তোদেরকে আমি মিথ্যা বলা ‍শিখিয়েছি! তন্বী তো শুনেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল! “কি হয়েছে? বল? কি হয়েছে ওর?”
“না তেমন কিছুই হয়নি..আপনি আগে চলেন।” কেমন মিথ্যুক দেখেছেন আপনারা! আমার মাথার উপর দিয়ে বাসের চাকা চলে গেছে আর বলছে কিছু হয়নি!
এদিকে পুলিশ আমার লাশটা রাজশাহী মেডিকেলে নিয়ে আসলো। সেই চির চেনা পরিবেশ। কতবার যে কত মানুষের জন্য এসেছি। মাত্র তিন মাস আগেই মেয়েটাকে কোলে করে নিয়ে গেলাম এখান থেকে আর এখন নিজেই এসেছি লাশ হয়ে! বউ আমার বাবুকে কোলে নিয়ে ছুটে আসলো। ছোট বাচ্চাটা এখনও বুঝতেই পারেনি যে সে এতিম হয়ে গেছে। বাবা, মা, বোন, চাচা, মামা, শ্বশুর, শ্বাশুড়ী বন্ধুরা অনেকেই এসেছে দেখছি। বাহ্! একসাথে এত পরিচিত মুখ দেখে ভালোই লাগছে। লিয়ানা....আমার মামনি, ওকে আর একটু কাছে আনছে না কেন? মেয়েটাকে কেমন বিসন্ন দেখাচ্ছে! ও কি টের পেয়ে গেছে যে ওর বাবা আর নাই! ও আর বাবার কোলে চড়ে ঘুরতে পারবে না! কি জানি, ছোট বাচ্চারা তো ফেরেস্তার মত, হয়তো সব বুঝতে পারছে।ওদিকে আমার বউ দেখি কাঁদছে! মহা মুষ্কিল! তন্বী, ছিঃ! এইভাবে কাঁদতে হয় না। আমি তো তোমাদের ছেড়ে যেতে চায়নি। কিন্তু আমার কি দোষ বলো? ঘাতক বাস তো আমাকে বাঁচতে দিল না। তুমি ভেঙে পড়ো না প্লিজ! আমি আর তুমি একসাথে কত বিপদ পার করেছি ভেবে দেখো....কখনো কি আমাকে হতাশ হতে দেখেছো? তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড়ো তাহলে বাবুর কি হবে? ও তো কেবল তিন মাস। আরও অনেক দিন বাকি আছে...এখন থেকে তো আমি সবসময় তোমাদের সাথে ছায়ার মত থাকতে পারবো। প্লিজ একটু শান্ত হও! আমি আর তোমাকে বিরক্ত করবো না। সারারাত জেগে থাকবো না। এখন তো কেয়ামত পর্যন্ত ঘুমিয়েই কাটাতে হবে। তোমার হাতে খাওয়া খুব মিস করবো। তারপরও কি করবো বলো? এটা কি আমার দোষ? আমি তোমাকে হয়তো ভালোবাসা ছাড়া কোনদিনই দামি দামি শাড়ি গয়না দিতে পারিনি। কিন্তু ভালোবাসার উপরে আর কিছু হয় বলো?
লিয়ানা ফাতিহা....নামটা আমার দেয়া। আমার একমাত্র সন্তান, আমার সব। মারে, পারলে ক্ষমা করো আমাকে। পিতা হিসাবে তোমার এই ক্ষুদ্র জীবনে যতটুকু সামর্থ্য ছিলো করেছি। আফসোস তোমাকে বড় দেখে যেতে পারলাম না! কত ইচ্ছা ছিলো তোমাকে মানের মত করে মানুষ করব। আমি যা পাইনি তার সব তোমাকে দিব। হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাবো, শপিং করবো, খেলবো, তোমার বিয়ে দিব.....তারাপর নাতি-নাতনির সাথে আনন্দ করে পরপারে যাব। কিন্তু হারামজাদা বাসটা তা হতে দিল নারে মা! এই বয়সে তুমি এতিম হয়ে গেলে! তোমার জীবন টা অনেক কঠিন হয়ে গেল। জীবনের প্রতি পদে আমার অভাব বুঝতে হবে তোমাকে। তাই বলে কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না। অনেকেই আছে যাদের বাবা-মা দুটোই নাই। তোমার তো তাও মা আছে। তোমার এখন অনেক দায়িত্ব। বড় হয়ে মাকে দেখে ‍শুনে রাখতে হবে না? মার তো এখন তুমি ছাড়া আর কেউ থাকলো না। মাগো, একটাই দোয়া করি তোমার জন্য, সবসময় সত্যকে সত্য বলে জানিও....মিথ্যার আশ্রয় নিও না কখনো। তোমার জন্য হয়তো টাকা পয়সা, ধন সম্পত্তি কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। কিন্তু তোমার মাকে রেখে গেলাম। মাকে কখনোই অসম্মান করো না। এই মানুষটা তোমার বাবার জন্য সব বিসর্জন দিয়েছে। অনেক কষ্ট তার মনে।
বাবা...আমার বাবা। একমাত্র ছেলের লাশের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে। কখনোই আমাদের দুই ভাইবোনের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেননি এই মানুষটা। আমার সব অনিয়ম, অন্যায় আবদার মুখ বওজে মেনে নিয়েছেন। তারপরও অবুঝ আমি সবসময় তার সাথে উপদেশ গুলো অমান্য করেছি। বাবার ইচ্ছা ছিলো আমি যেন পড়ালেখা করে অনেক বড় হই। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। আব্বু, আমার উপর অনেক রাগ করে আছো, তাই না? তমি আমার কাছে আসছো না কেন? কাছে এস আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও। তোমার সন্তানকে তো আর বেশিক্সণ কাছে পাবে না। আমাকে চলে যেতে হবে। তুমি কি বুঝতে পারছো আমার কথা?
আমার মা, তার কান্না কেউ থামাতে পারছে না। প্রাইমারী স্কুলের টিচার আমার মা। ছোট থেকেই আমাদের সে রকম সময় দিতে পারেনি। কিন্তু যতক্ষণ কাছে থেকেছে বুকে আগলে রেখেছে। মাগো....কেঁদে আর লাভ নাই। আমি তো আর ফিরবো না মা। তোমাদের কাছে আমার দুইটা কলিজার টুকরা রেখে গেলাম। পারলে একটু দেকে রেখো। কতদিন তোমাকে দুঃখ দিয়েছি! পারলে ক্ষমা কর মা। মাদের মন তো অনেক বড়্ ক্সমা করবে না মা?
অর্চি...আমার একমাত্র ছোট বোন। এই পাগলী, তুই এই ভাবে কান্নাকাটি করলে হবে? আর সবার মত তুই ও যদি এরকম করিস তা হলে কেমন হয় বল? তুই না কত কিছু বুঝিস। একটু থাম আপু। ঐ দেখ লিয়ানা তোর দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে একটু কোলে কেরে আমার কাছে নিয়ে আয়.....আমি যেমন তোকে ছোট থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি, আমার মেয়েটাকেও একটু দেখিস। তোকে কিন্তু আর্মি অফিসার হতেই হবে। আর আমি তো চলেই গেলাম...বাবা মাকে তোকেই দেখে রাখতে হবে কিন্তু। বাবা-মার মনে কখনোই কষ্ট দিবি না প্রমিস কর। আমি যে ভুল গুলো করেছি সেগুলা তুই কখনই করবি না, ঠিক আছে?
বন্ধুদের মধ্যেও অনেকে এসেছে দেখছি। এই শুভ্র, কিশোর, সেলিম, বিশ্ব তোরা বোকার মত দাঁড়িয়ে কি দেখছিস? কাছে আয় গাধার দল। আমি তো পারছি না। সোহের টা আবার আহাম্মকের মত কাঁদছে কেন? ওকে কেউ থামা! আরে গাধা, এই ভাবে কাঁদলে কি আমি ফিরে আসবো! আমি আর তোদেরকে জ্বালাবো নারে। রুবেল মামা, আপনার সাথে আর গাড়িতে ঘোরাও হবে না। এই শোন, তোদের কে যদি কোন কষ্ট দিয়ে থাকি মানে রাভিস না প্লিজ। আর আমার মেয়েটার দিকে একটু খেয়াল রাখিস।
বাবা, আমাকে এখানে ফেলে রেখেছো কেন? আমি বাসায় যাবো। ধুর...এই গন্ধ মেডিকেলে কেউ থাকে। আমাকে প্লিজ বাসায় নিয়ে যাও। আমি শেষ বারের মত আমার বিছানায় আরেকটু ঘুমাতে চাই। পুলিশরা বলছে আমার নাকি পোস্ট মর্টেম করবে! কি লাভ বলো বাবা? পোস্ট মর্টেম এ নাকি অনেক কষ্ট হয়। আমাকে নিয়ে চলো। আমি এখানে থাকবো না।
দুপুরের পর হসপিটালের সমস্ত ফরমালিটি সেরে আমাকে নিয়ে সবাই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কিন্তু বাসার চারপাশে এত্ত ভিড় কেন? ওমা....এত এত পরিচিত মুখ কিন্তু আমি তো কারও সাথেই কথা বলতে পারছি না। সবাই কি মনে করবে! বাসায় দেখি আত্মী স্বজন ভর্তি। সবার চোখে পানি। কেমন লাগে বলেন আপনারা? এভাবে সবাই মিলে কাঁদলে কি হবে! কত কাজ বাকি এখনো!
কে? জনি ভাই নাকি? এত দেরি হলো কেন? কাজে গেছিলেন? আপনাকেই তো খুজছিলাম এতক্ষণ। আপনার তো বিশাল দায়িত্ব। আমার কবর খুড়তে হবে না? আপনাকে তো আগেই বলে রেখেছি। আর শোনেন, আপনার ভাবির খোজ খবর নিতে ভুলবেন না কিন্তু। মেয়েটাও থাকলো। অবশ্যই সবসময় দেখে রাখবেন। স্কুলে নিয়ে যাবেন....চিপস কিনে দিবেন.....আর আমার গল্প শোনাবেন। আমার মেয়েটাকে যেন কেউ কষ্ট না দেয়। তা না হলে কিন্তু আপনার খবর আছে। ভুত হয়ে আপনার ঘাড় মটকাবো আমি!
আসরের মধ্যে গোসল কমপ্লিট। সাদা কাফনে জড়িয়ে আমাকে এখন বাসার ডাইনিং এ রেখেছে। সন্ধ্যার একটু আগে আমাকে কবর দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিল সবাই। ঠিক আছে, আমি চলে যাবো, কিন্তু আমার মেয়েটা কই? এই তন্বী, মেয়েটাকে আমার কাছে একটু আনো। শেষবারের মত ওকে একটু ছুঁয়ে দেখবো। কি হলো? কে আছো? আমার মেয়েটাকে আমার কাছে নিয়ে আসো! মেয়ে আমার প্রত্যেকদিন বিকালে বাইরে ঘুরতে বের হত আমার সাথে। পাউডার মাখালেই খুশি হয়ে যেত, ভাবতো বাইরে নিয়ে যাব। তিন মাস বয়সেই বাবাকে চিনে ফেলেছিলো। কত কথা বলতো আমার সাথে...এখনই মা বলতে পারে। আর কয়দিন পর বাবা বলাও শিখে যেত। পাকানি হবে একটা! কিন্তু আফসোস মেয়ের মুখে বাবা ডাক শুনতে পেলাম না!
এইবার মনে হয় আমাকে কবর দেওয়ার জন্য টিকাপাড়া গোরস্থানে নিয়ে যাবে। শেষ বারের মত বাড়িটা ঘুরে দিখলাম। আর কোনদিন তো আসা হবে না! আমাদের ঘর, কম্পিউটার, আমার প্রিয় ল্যাপটপ, ছোট্ট লিয়ানার বিছানা আরও কত কি! স-ও-ব ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে! কি আর করার আছে! যায়....আর তো থাকা যাবে না। সবাই মিলে খাটিয়ায় তুলে আমাকে নিয়ে গোরস্তানের দিকে রওনা হল। পুরো পাড়ায় কান্নার রোল উঠল নতুন করে। রিয়ন আর বাবা সামনে ধরেছে। শুভ্র আর সোহেল ধরেছে পিছনে। তন্বী, লিয়ানা, অর্চি, আম্মু....কই তোমরা? আমার কাছে আসো.....শেষবারের মত আমাকে দেখে যাও। আমি তো আর থাকবো না। আমার মেয়েটাকে আমার কাছে কেউ নিয়ে আসছো না কেন? আমি তো শেষবারের মত ওকে একবার দেখতে চাই! মাগো...কই তুমি? ও লিয়ানা....লিয়ানা.....বাবার কাছে আসো একবার.....তোমার কপালে শেষ বারের মত একটা চুমু দিতে চাই।
মাগরিবের আগে জানাজা শেষ হলো...অনেক দূর দূর থেকেও অনেকে এসেছে। নামায শেষে বাবা সবার কাছে আমার হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিল। বাবা অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছে! মাগরিবের নামায শেষ হতেই আমাকে কবরে নিয়ে যাওয়া হলো। বাহ্....জনি ভাইতো ভালোই কবর বানিয়েছে। কবর....কেয়ামতের আগে এটাই আমার স্থায়ী ঠিকানা। অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? আমাদের প্রত্যেককেই কবরে যেতে হবে। কিন্তু আমি মনে হয় একটু আগেই চলে এলাম! কবরে শোয়ানোর পর সবাই তিন মুঠো করে মাটি দিল। আমি অন্ধকারে চাপা পড়ে গেলাম.....অন্ধকার....নিকষ কালো অন্ধকার! সবাই যে যার মতো চলে গেল। কিন্তু বাবা এককোণে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এখনো...। বাবা....তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে থেকো না তোমাকে দেখে আমার কষ্ট হচ্ছে! প্লিজ চলে যাও....প্লিজ!
কবর সম্পর্কে আগে অনেক ভয় ছিলো! না জানি কেমন লাগবে থাকতে। কিন্তু এখন কি ভয় পেলে চলবে। এখানে তো আর তন্বী ঘুম দিয়ে দিবে না! এটাই এখন আমার স্থায়ী ঠিকানা। অভ্যাস হযে যাবে ধীরে ধীরে....।
অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে কিছুই করার নাই। একটু পরই হয়তো বিচার শুরু হবে। কিন্তু ভাবছি কি দোষ ছিলো আমার? আল্লাহ্ কেন আমার তিন মাসের মেয়েটাকে এতিম করলো? কেন এত অল্প বয়সে আমার বউকে বিধবা হতে হলো? যে বাবা কোলে পিঠে করে বড় করেছে কেনই বা তার কাঁধে চড়ে কবরে আসতে হলো? আমি কার কাছে এর বিচার চাইবো? হতভাগী বউ আমার এতিম মেয়েটাকে নিয়ে কোথায় যাবে? কি করবে? মেয়ের দুধ কেনার টাকাই বা কোথায় পাবে? মেয়ে আমার কার কাছে বায়না ধরবে? আমার এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর কি আপনারা কেউ দিতে পারবেন? কারো কাছে উত্তর আছে? কি হলো? কেউ কথা বরছেন না কেন? আর কতদিন আপনারা চুপ করে থাকবেন? আর কত লিয়ানাকে এভাবে পিতৃহারা হতে হবে? আর কত তন্বীকে এই ভাবে অল্প বয়সে বিধবা হতে হবে? ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে মেয়েটা একন কোথায় যাবে? আর কত বাবাকে এই ভাবে ছেলের লাশ কাঁধে বইতে হবে? আর কত রুবায়েত অদক্ষ চালকের হাতে প্রাণ দিলে আপনারা বুঝবেন? প্লিজ জেগে উঠুন সবাই। আমার মত, আমার সন্তানের মত, আমার পরিবারের মত আর কারো জীবনে যেন এইরকম না হয়। সবাই সোচ্চার হন। আমরা বাঁচতে চাই...এবাবে সড়ক দুর্ঘটনায় লাশ হতে চাই না আর.................।।
বি.দ্র: লেখাটি আমার নয়, ভালো লাগলো তাই শেয়ার করলাম। লেখাটি এখানে প্রকাশিত

সামুদ্রিক কল্পকাহিনী : ওটা কী ছিল?

সামুদ্রিক কল্পকাহিনী : ওটা কী ছিল?
ব্যক্তিগত জীবনে আমি লেখালেখিতে কখনই অভ্যস্ত ছিলাম না। বয়স তো কম হলো না। এ পযর্ন্ত জীবনে কোন কবিতা কিংবা ছোট গল্প লিখেছি কিনা মনে পড়ে না। তারপরেও লিখতে বসলাম কারন না লিখে যাওয়াটা অন্যায় মনে হচ্ছে বা হবে আমার জন্য। তবে ইদানিং লিখার চেষ্টা করছি।  হয়তো ঘটনাটা অনেক রাঙিয়ে বর্ণনা করতে পারবো না, যেটা সাধারনত প্রফেশনাল লেখকদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে এতটুকু বলতে পারি যে, ঘটনাটি আপনাদের ভালো লাগবে। আমার জানা কোন তথ্যই বাদ পড়বে না এতে। তারমানে হচ্ছে এই যে, ব্যাপারটি সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি ঠিক ততটুকুই জানাব আপনাদের।
যাক অনেক বলে ফেললাম। এখন আমার পরিচয় দেয়া যাক। ব্যক্তিগত জীবনে আমি একজন ব্যবসায়ী। দেশ থেকে বিদেশে বা বিদেশ থেকে দেশে আমার আমদানী-রপ্তানীর ব্যবসা রয়েছে। আমার বাড়ি নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে। তবে আমার জন্ম হয়েছে লস এঞ্জেলসে। হয়তে প্রশ্ন করতে পারেন মহাসাগরের এক তীর থেকে অন্য তীরে কেন এলাম? তাহলে বলে রাখি এক প্রকার ব্যবসা বা জীবন বাঁচানোর তাগিদেই ম্যানহাটনে আসা। আমার বাবা ছিলেন একজন কোস্টগার্ড। তাই অধিকাংশ সময়েই তিনি সমুদ্রে কাটাতেন। আমার রক্তেও তাই সমুদ্রের লোনা গন্ধ ঢুকে পড়েছিল। তবে জীবনের অর্ধেকটা সময় পযর্ন্ত সমুদ্রের দেখা তেমন পাইনি। আমার স্ত্রী নিউজিল্যান্ড-ভারতীয় বংশদ্ভূত। আমি লস এঞ্জেলসে আর ও নিউজিল্যান্ডের- যাক সে অন্য কাহিনী। আমার দুটো ছেলে একটি মেয়ে। ছেলে দুটো বড়, মেয়েটি ছোট।
বয়স তখন আনুমানিক পয়ত্রিশ। দেহে তখনও যৌবনের ভাটা পড়েনি। একবার এক বিকেলে বারান্দায় বসে পাইপ টানছিলাম আর রাস্তা দিয়ে লোকজনের আসা যাওয়া দেখছিলাম। এমন সময় আমার এক পুরোনো বন্ধুর আগমন ঘটল। আমরা এক সাথে স্কুলে পড়তাম।ওর বাবা আমার বাবার বন্ধু ছিল। তিনি ছিলেন একটি তিমি শিকারী জাহাজের নাবিক। আমার বন্ধুটি ওর বাবার পদাঙ্ক অনুসরন করেছে। প্রায় আট বৎসর পর ওর সাথে দেখা। বন্ধুকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরলাম।
আমার যদি চোখ ঠিক থেকে থাকে তাহলে এ্যাডমন্ড তুই এখন আমার সামনে দাড়িয়ে আছিস, আমি বললাম।
তুই নির্ভূল বলেছিস, জোসেফ বুড়ো খোকা।
ওহ্, ভাবতেই পারিছিনা, এ্যাডমন্ড, আজ এই বিকেলে তুই, সেরা একজন নাবিক, যে কিনা নাওয়া খাওয়া ভূলে সারাক্ষন তিমি নামক উজবুক আর বিশাল মাছের পেছনে ধাওয়া করে, এখানে আমার সামনে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছিস!
বিশ্বাস কর, জোসেফ, আমি এই তিমি শিকারী বুড়ো এ্যাডমন্ড, তোর সামনে বসে আছি, বিশ্বাস না হলে আমার চেয়ারটা লাথি মেরে একবার ফেলে দিয়ে দেখ।
পাঠক আমি আগেই বলেছি, এ্যাডমন্ড আমার বাল্যবন্ধু। তাই আমাদের মধ্যে এ রকম হেয়ালীপূর্ণ কথাবার্তা হর-হামেশাই হত। দুষ্টুমিতেও ছিলাম আমরা এলাকার সেরা। এক কথায় চরম ডানপিঠে।একদা দুজন মিলে একটি সওদাগরী জাহাজ ডুবিয়েই দিয়েছিলাম তার তলা ফাঁক করে দিয়ে। যাক অনেকদিন পর বন্ধুকে দেখে সেই হেয়ালীপূর্ণ ধরন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
তারপর কি মনে করে এই নিবোর্ধ বন্ধুর কাছে আজ তোর আগমন, আমি জিজ্ঞেস করলাম।
দেখ জোসেফ পলিন, তুই যদি তোর বাবা মি. গুস্তাভ পলিনের মত হয়ে থাকিস আর আমি যদি ভাবি এই ছুটিতে আমি আমার এক বন্ধুর সাথে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেব তাহলে কি ভূল করেছি বলে তুই বলতে চাস?
ওহ্, আমি কি গর্দভ! তু্ই একদম ঠিক চিন্তাই করেছিস মহান নাবিক মি. পল এ্যাডমন্ডের যোগ্য পুত্র এ্যাডমন্ড হল।
নে নে হয়েছে এবার থামা, হাসতে হাসতে এ্যাডমন্ড বলল।
ঠিক আছে ঠিক আছে, তাহলে এখন বল তোর ওদিকটার খবর কি? আমি জানতে চাইলাম।
কোন দিকটা, পরিবার নাকি জাহাজের খবর?
তোর পরিবার? যতদূর জানি আঙ্কেল গত হয়েছেন তিন বৎসর আগে আর আন্ট জেনেলিনা এখন থাকেন লস এঞ্জেলসে, এছাড়া আর কেই বা আছে তোর পরিবারে, তোর মত হার্ড মাইন্ডেড লোকের কাছে কোন মেয়ে আসবে জীবন নিরামিষ করতে?
দারুন একটা উক্তি করেছিস দোস্ত, আমি এখনও বিয়ে করিনি, আর মা’ও গত হয়েছেন দুমাস হল, তোকে ব্যাপারটা জানাতে পারিনি বলে দু:খিত। তবে এখন ভাবছি বিয়ে করব, আমি ছাড়া তো কেউ নেই, বংশের ধারা তো রক্ষা করতে হবে, কি বলিস?
তা যা বলেছিস, আমি বললাম, তা কোন এলাকার মেয়ে তোর পছন্দের তালিকায় পড়ে?
গতকাল রাতে এখানকার এক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে, হোটেলে, মেয়ের বাবা হোটেলে চাকুরি করে, হোটেলের খাবারে ভদ্রলোকের এ্যালার্জি হয় যার কারতে প্রতিদিন মেয়েটিই হোমমেইড খাবার দিয়ে যায় বাবাকে, একদমে কথাগুলো বলল এ্যাডমন্ড।
কোন হোটেল বলতো? এখানে মানে এই ম্যানহাটনে? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
আরে না, হোটেলটা নানটুকেটে। তুই তো জানিস ওটাই আমাদের স্বর্গরাজ্য বলে পরিচিত। তাহলে তো, আমি বললাম, কাল একবার নানটুকেট যেতে হয়।
পাঠক নানটুকেট হচ্ছে একটা দ্বীপ। যেটা ম্যাসাচুসেটস উপকূলের একটা দ্বীপ। এখানে এসেই নোঙ্গর করে সকল তিমি শিকারী জাহাজগুলো।
আমি এ্যাডমন্ডকে আমার স্ত্রী এবং সন্তানদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। বাচ্চারা এমনিতেই এ্যাডমন্ডের নামের সাথে ও চরিত্রটির ব্যাপারে আগে থেকেই জানত। কারন আমি এ্যাডমন্ড ও আমার ছোটবেলার অনেক গল্প শুনিয়েছি তাদের। তাই এ্যাডমন্ডকে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই ওরা হইচই করে উঠল এবং তখনই ঠিক হয়ে গেল এ্যাডমন্ড আজ রাতে বাচ্চাদের সাথে ঘুমুবে আর কাল ভোরে উঠে আমরা সবাই যাব নানটুকেট।
পরদিন বিকেল নাগাদ আমরা পৌছে গেলাম নানটুকেট। এ্যাডমন্ড যে হোটেলটির কথা বলেছিল সেটি আসলে একটি সরাইখানা। আর তা শহরের প্রাণকেন্দ্রে। বলতে গেলে জেটি থেকে অনেক দূরেই। প্রথম দর্শনেই সরাইখানাটি আমার অপছন্দ হয়ে গেল। সরাইখানার প্রবেশমুখটি একটি গুহার আদলে তৈরী। শুরকি ও রং মিশিয়ে একেবারে গুহামুখের মতই করেছিল এককালে। কিন্তু এখন জায়গায় জায়গায় আস্তর খসে পড়েছে। দেখলে মনে হয় বহু প্রাচীন একটি গুহামুখ, আর তাতে অনেকদিন কেউ যাতায়াত করেনি। নামটিও গুহামুখের সাথে খাপ খাইয়ে রাখা হয়েছে “দ্য কেভ অব হ্যাভেন”। এ ধরনের একটি সরাইখানার মধ্যে “হ্যাভেন” পেল কোথায় তা আমি ভেবে পেলাম না। এক ‘হেভেন’ না বলে বলা উচিত ‘অড’। কত রকম মানুষের বাস এ পৃথিবীতে আর তাদের বুদ্ধিতেও ভিন্নতা আছে। আর মিল নেই তাদের রুচিতেও। যাই হোক আমরা “দ্য কেভ অব হ্যাভেন” নামক সরাইখানাটির ভেতরে প্রবেশ করলাম। আর সাথে সাথেই দেখতে পেলাম বাহিরের মতই সরাইখানার ভেতরেও গুহার আদলে তৈরী হয়েছে। ঠিক বুঝলাম না, সরাইমালিকের গুহা এত পছন্দ কেন?
রিসিপশনে একজন মহিলা বসা। গায়ের রং কালো, হোৎকা টাইপের দৈহিক গড়ন, কোকড়ানো চুলগুলো পেছন দিকে বেণী করা। বয়স মাঝারী ধরনের। চোখ দুটোতে উজ্জল দৃষ্টি ঠিকরে পড়ছে। দেখলেই বোঝা যায় এ মহিলা ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে এবং মাথায় অনেক বুদ্ধি ধরে। জানা গেল ইনি হচ্ছেন বারমেড। বারটেন্ডারের অনুপস্থিতিতে ইনি সরাইখানার দেখাশুনা করেন। বারটেন্ডার কি একটা কাজে বাইরে বেরিয়েছে, আসবে ঘন্টা দুয়েক পর। আমরা আজ রাতে থাকার জন্য দুটি কামরা রিজার্ভ করলাম। এ্যাডমন্ড যে মেয়েটির কথা বলেছিল সে এল আমরা পৌঁছার ঘন্টা তিনেক পর। অনেক কথা হল তার সাথে, তার বাবার সাথে। ভদ্রলোকের নাম মি. জোহান বাক্নার। চেহারা ও আচার ব্যবহার মোটামুটি ভালোই।। আমাদের সকলেরই পছন্দ হল। বাচ্চারা তো বলতে গেলে একেবারে মজে গেল। ভদ্রলোকের বাচন ভঙ্গিও চমৎকার। জানা গেল, এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম মি. জোহানের। নিজের অবস্থাও ভালো ছিল। যুবক অবস্থায় তিমি শিকারী জাহাজের বাবুর্চি ছিলেন। ভালই আয় করেছিলেন। বছর বিশেক কাজ করার পর হাতে কিছু পয়সা জমে। আর তা দিয়ে একটুকরো জমি কিনে তাতে সবজি বাগান করেন মি. জোহান। সবজি বাগানের পরিচযা করত মিসেস. জোহান এবং এঞ্জেলা। কিন্তু বিধি বাম। একবার এক জলোচ্ছাসে সব ধ্বংস হয়ে যায়। মিসেস. জোহান মারা যান। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে মি. জোহাস পড়েন বিপাকে। তিনি চাকরি নেন এই সরাইখানায়। আর মেয়ের নিজের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাটা সমাপ্ত করে এখন একটা প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষিকার কাজ করে। বাপ মেয়ের সংসারে এখন মোটামুটি আয় হচ্ছে ভালই। অচিরেই নিজেরা একটা সরাইখানা দেয়ার ধান্ধায় আছেন। যাক বোঝা গেল ভদ্রলোক ও তার মেয়ে একদম ফ্রী। এ্যাডমন্ড তো খুশিতে একদম গদগদ হয়ে আছে। সে একটু পরপর আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে আর ইশারা করে বলছে “কিরে কেমন বুঝলি?”- আমিও ইশারায় বুঝিয়ে দিলাম “পরে বলব-একটু ধৈয্য ধর।“ অবশেষে এঞ্জেলা বিদায় নিল। আমরা জমায়েত হলাম আমাদের কামরায়। আমি ঠিক করেছি আমি আর সারাহ (আমার স্ত্রী) ঘুমাব এক রুমে আর বাচ্চারা ও এ্যাডমন্ড ঘুমাবে আরেক রুমে। তারপর আমি বললাম, এ্যাডমন্ড কেমন হল?
কি হল? এ্যাডমন্ডের বিস্ময়সূচক জিজ্ঞাসা।
না মানে কেমন দেখলি, কি বুঝলি?
কি বুঝলাম মানে? আরে বুঝবি আর দেখবি তো তুই আর ভাবি। তোদের নিয়ে এলামতো  সে জন্যই।
আর বাচ্চারা, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন মনে হল তোমাদের নতুন আন্টিকে?
দারুন, চমৎকার, বাচ্চারা হইচই করে উঠল।
তাহলে তো হলই, আমি বললাম।
তাহলে তো হলই, মানে? তুই কি ফিট বলতে চাচ্ছিস, এ্যাডমন্ডের জিজ্ঞাসা।
আহা, এ্যাডমন্ড ব্রো, আপনি কি এখনও আমাদের মতামত বুঝতে পারেন নি, আপনি বরং মি. বাক্নার এর সাথে কথা বলুন বিয়ের দিনক্ষন ঠিক করার ব্যাপারে, তুমি কি বল? সারাহ সাপোর্টের আশায় আমার দিকে তাকাল।
তুমি ঠিকই বলেছ, হানি। আমিও ঠিক একই কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
তাহলে, এ্যাডমন্ড বলল, আমরা কাল দুপুর নাগাদ সব কথা পাকা করে ফেলছি, তারপর আর কি, হ্যা হ্যা।
হ্যা হ্যা আমিও ওর হাসির প্রত্যুত্তর দিলাম। আমাদের হাসি সংক্রামিত হল সকলের মুখে।
পরদিন দুপুরের দিকে এ্যাডমন্ড সব কিছু ঠিক ঠাক করে ফেলল। ঠিক হল আগামী সপ্তাহে রোববার স্টার সানডের বিশেষ দিনে বিয়ে হবে ম্যানহাটনে, আমাদের বাড়ীতে কাছের গির্জায়। আমরা সেদিনই ম্যানহাটনে ফিরলাম। নির্দিষ্ট সময়ই বিয়ে হয়ে গেল এ্যাডমন্ড আর এঞ্জেলার। ওদের হানিমুনও হল আমাদের বাড়িতেই। বিয়ের দু’সপ্তাহের মাথায় নানটুকেট থেকে খবর এল এ্যাডমন্ডকে সেখানে যেতে হবে, জরুরী তলব। ঐদিনই এ্যাডমন্ড নানটুকেট গেল। এঞ্জেলা রইল আমাদের কাছে। ঐ দিনটি এ্যাডমন্ড নানটুকেট থেকে গেল। পরদিন দুপুরের দিকে ফিরল ম্যানহাটনে।ও ফিরতেই ওর চোখমুখে উত্তেজনা লক্ষ্য করলাম। বুঝলাম শীঘ্রই সমুদ্রে ফিরবে ও। কেন আমার এ রকম ধারনা হল তা আজও আমি বলতে পারব না।
অনেকটা প্রাকৃতিক খেয়ালেই বা টেলিপ্যাথির জোড়েই হয়ত আমার এ রকম ধারনা হয়েছিল এবং ধারনা সত্যি হয়েছিল। কিছুটা সুস্থির হওয়ার পর সেদিন এ্যাডমন্ড আমার সাথে বারান্দায় এসে বসল।
তারপর, আমি বললাম, কেন গিয়েছিলি নানটুকেট?
আর বলিস না, এ্যাডমন্ড বলতে লাগল, ক্যাপ্টেন খবর দিয়েছিলেন। বাহক এসে বলল জাহাজে জরুরী ডাক পড়েছে, তা তো তুই শুনেছিস।
তা কি খবর, সব ঠিক আছে তো? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
হ্যা, সবকিছুই ঠিক আছে, তবে এক সপ্তাহের মধ্যেই আবার সমুদ্রে ফিরতে হবে, এ্যাডমন্ড বলল।
কেন, তুই তো ছুটি এনেছিলি, আমার জিজ্ঞাসা।
তা ঠিক, তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী এমনকি রাষ্ট্রপতির আদেশ তো ফেলনার নয়, কি বলিস? এ্যাডমন্ড টিটকারির সুরে বলল আমাকে।
কি বলতে চাস তুই, ঠিক ভাবে বলতো, আমি বিরক্ত হয়ে বললাম।
চরম একটা খবর বন্ধু, এ্যাডমন্ড বলতে শুরু করল, নানটুকেট গিয়ে দেখি আমাদের জাহাজটি জেটিতে নোঙর করে আছে। ক্যাপ্টেন স্যার ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে জাহাজের ডেকে বসে আছেন। তাকে ঘীরে দাড়িয়েছে আমাদের জাহাজের প্রায় সকল কর্মচারীগন। আমিও গেলাম। আমাদের জাহাজের থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল আমাকে একটা চেয়ার টেনে বসতে বললেন। ক্যাপ্টেন আমাকে স্বাগত জানালেন। আমিও তার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম এবং প্রত্যেকের সাথে হ্যান্ডশেক করলাম।
সবাই কি এসে পড়েছে? ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করলেন সহকারী ক্যাপ্টেন মি. জোহান সুইটকে।
না স্যার, একজন বাকি আছে, মি. বিলি মেন আসেন নি।
মি. বিলি মেন হচ্ছেন জাহাজের প্রধান চার হারপুনারদের মধ্যে একজন।
ঐ তো স্যার উনি এসে পড়েছেন, চিৎকার করে উঠল মি. সুইট।
হ্যা, এবার শুরু করা যাক, ক্যাপ্টেন বললেন অবশেষে। আমার কাছে চিঠিটি পৌঁছেছে গত চারদিন আগে। চিঠিটি পাঠিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী মি. বার্ক এন্ডারসন। চিঠিটি আপনাদের আমি সম্পূর্ণ পড়ে শোনাচ্ছি, এই বলে মি. কেট বন্ড, আমাদের জাহাজের ক্যাপ্টেন, চিঠিটি পড়তে লাগলেন।
প্রিয় মি. কেট বন্ড, এই জেনে আমি গবির্ত যে, আপনার মত একজন ক্যাপ্টেন আছেন যিনি অসাধ্য সাধন করতে পারেন। আমি আপনার জাহাজ, আপনার নিজের এবং আপনার ক্রুদের প্রশংসা শুনেছি। আপনারা দেশের অর্থনীতির সামুদ্রিক খাতে যা দিয়েছেন তা আজ আর আমি বিস্তারিত বর্ণনা করতে চাইনা। আপনাদের জাহাজের মালিক মি. আরনল্ড হলম্যান এর কাছে অনেকবার প্রশংসা ও ধন্যবাদ পত্র পাঠিয়েছি। তিনিও তার জাহাজের সকল ক্রুদের প্রশংসা করেছেন। যাই হোক, আসল কথায় আসা যাক। আপনি হয়ত শুনে থাকবেন যে, গত দুই সপ্তাহ আগে আমাদের মহাকাশ টেলিস্কোপে নানটুকেটের অধূরে সাগরে একটি অদ্ভুত প্রানীর দেখা পাওয়া গেছে। প্রানীটি দেখতে নীল তিমির মত বড়। আমরা সকলেই জানি নীল তিমির লেজ হোমোসার্কাল অথচ সেই প্রানীটির লেজ হেটারোসার্কাল। প্রানীটির মুখ দেখতে ডলফিনের মত এবং সমস্ত দেহ আঁইশে আবৃত। প্রানীটি তিমির মত পানির ফোয়ারা সৃষ্টি করতে পারে। দেহে পাখনা আছে এবং তা দেখতে হুবহু হাঙরের মত। পিঠের দিকের রঙ ধূসর এবং পেট সাদা। প্রায় দুই মিনিটের জন্য প্রানীটি সারফেসে উঠেছিল যার ফলে টেলিস্কোপ এত কিছু সনাক্ত করতে পেরেছে। আশ্চযের ব্যাপার হচ্ছে ঐ দিনের পর একে আর কোথাও দেখা যায়নি। মি. বন্ড বুঝতেই পারছেন এ রকম অদ্ভুত প্রানীর ব্যাপারে দেশের বৈজ্ঞানিক নামের ইতিহাসে নতুন একটি নামের যোগ হবে। হবে গবেষনা। হয়ত এর থেকে প্রকাশ পাবে নতুন কোন বিবর্তনের তথ্য, হয়ত পাওয়া যাবে অমূল্য ঔষধ কে বলতে পারে সে কথা?
মি. বন্ড আমি আপনার সুনামের পরিপ্রেক্ষিতে এতটুকু অনুরোধ করতে পারি, আপনি যদি প্রানীটি ধরা বা খোঁজার ব্যাপারে আমাদের নেভিকে কোনরূপ সাহায্য করতে পারেন তাহলে কৃতার্থ হব। এর জন্য অবশ্য সরকার আপনাকে যথাযথ সম্মানিত করবে। যদি আপনি সম্মত হন তাহলে আগামী সাত দিনের মধ্যে আমার সাথে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করছি। আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।
এতটুকু পড়ে মি. বন্ড থামলেন। বললেন নীচে মি. বার্ক এন্ডারসনের সাইন ও সিল রয়েছে। এরপর তিনি আমাদের সকলের দিকে একবার করে চোখ বুলালেন্ এরপর জাহাজের ফার্স্টমেট মি. সলোমন করিমের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি বুঝলেন মি. করিম, এখন আমাদের কি করা উচিত?
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মি. সলোমন আমাদের জাহাজের সবচেয়ে সাহসী ব্যাক্তি, বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারেও তার কোন জুড়ি নেই। তিনি সাথে সাথে বললেন, মি. এন্ডারসনকে আপনার সম্মতি জানিয়ে দেয়া উচিৎ স্যার। ভদ্রলোক আপনার উপর ভরসা করে আছেন। কোন চিন্তা করবেন না, আমরা প্রানীটিকে খুজে বের করব ইনশাআল্লাহ, তবে ধরতে পারব কিনা তা বলতে পারছি না, কারন প্রানীটির গতিবিধি আমাদের কাছে অজানা এবং কতটুকু আক্রমনাত্মক সেটাও।
মি. করিম কোন কথাকে জোর দিয়ে বোঝানোর জন্য উপরোক্ত “ইনশাআল্লাহ” শব্দটি প্রয়োগ করেন এবং আমি দেখেছি উনি কোন কাজ করার আগে এই শব্দটি ব্যবহার করলে তিনি সেই কাজে সফলতা পান। এটা প্রমানিত, যার চাক্ষুস সাক্ষী আমি।
যাই হোক মি. বন্ড বললেন, একেবারে আমার মনের কথাগুলোই বলেছেন মি. করিম। আপনার সদিচ্ছার প্রশংসা করতেই হয়, আমার মনে হয় অন্য সকলেই আমাদের সাথে সম্মতি জ্ঞাপন করবেন, কি বলেন সবাই?
আমরা সবাই একে একে সম্মতি জানালাম তবে জাহাজের থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল বললেন, আমাদের আরও তথ্য নেয়া উচিত প্রানীটির ব্যাপারে, ঠিক কোথায় দেখা গেছে এবং একে জীবিত না মৃত অবস্থায় ধরতে হবে এসব ব্যাপার যা চিঠিতে উল্লেখ নেই। আপনি ঠিকই বলেছেন মি. সয়েল, আমার মনে হয় প্রানীটিকে জীবিত ধরতে বলা হবে, তবে কেন আমার এমন মনে হচ্ছে তা বলতে পারছি না, মি. বন্ড বললেন।
এরপর আরও কিছুক্ষন আলোচনার পর আমরা সবাই যে যার স্থানে ফিরে এলাম। আমাদের সবাইকে যেতে হবে আগামী সপ্তাহের সোমবারে। একেবারে প্রস্তুতি নিয়ে। এই হচ্ছে ঘটনা।
হু, শুনলাম, নিশ্চয়ই খুব এ্যাডভেঞ্চার হবে, তা তোদের জাহাজের সাথে নেভির কোন জাহাজ থাকবে নাকি? আমার জিজ্ঞাসা।
হ্যা, এ রকমই অনেকটা ইঙ্গিত রয়েছে চিঠিতে, তবে আমি শিওর না।
তোর কি মনে হয়, এ ধরনের প্রানী কি সত্যিই আছে নাকি? আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম।
থাকাটা অসম্ভবতো নয়ই, বরং সম্ভব। তার কারন এখন পযর্ন্ত হাজার হাজার প্রজাতির প্রানীর অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারে নি। তাছাড়া মিউটেশন, জিন-ডিএনএ-আরএনএ এ সবের দৈনন্দিন পরিবর্তনের ফলে জীব গঠনে যে রকম বৈচিত্র্য ঘটছে তাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়, এ্যাডমন্ড বলল।
হ্যা তোর কথায় যুক্তি রয়েছে, তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছিস, পরিবেশ দূষনের ফলে প্রানীদেহে নানা ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে, যার ফলে দেহে অনাকাঙ্খিত কোষের সংখ্যা বাড়ছে, এতে করে জীনের পরিবর্তন ঘটাটা অস্বাভাবিক নয়। মানুষের উচ্চতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, রোগ-রালাই প্রতিনিয়ত দেহের সঙ্গী হচ্ছে। জন্মগতভাবে অনেক শিশু প্রতিবন্ধি হয়ে জন্মগ্রহন করছে, আমার মনে হচ্ছে এগুলো সবই ঘটছে পরিবেশ দূষনের ফলে, তোর কি মত?
জোসেফ, আমি তোর সাথে একমত। আসলে এসব কিছুর জন্য মানব জাতিই দায়ী। যাকে বলে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।
আচ্ছা বাদ দে এসব আলোচনা, আমি বললাম, বয়সতো অনেক হল, জীবনে এখন পযর্ন্ত তেমন কোন এ্যাডভেঞ্চার হল না, কোন আনন্দও এল না, সমস্ত জীবন কাটিয়ে দিলাম শুধু ব্যবসার পেছনে। এখন আসল ব্যাপার হচ্ছে আমি তোর সঙ্গে জাহাজে যেতে চাই, নাবিকদের জীবন, সমুদ্রের প্রকৃতি আমি জানতে চাই।
কি বলছিস তুই, পাগল হয়ে গেছিস নাকি, তোর প্রানের চেয়েও প্রিয় ব্যবসা ছেড়ে তুই যেতে চাচ্ছিস এমন জীবনে যেখানে আছে আছে পযার্প্ত খাবার-না আছে কোন মেয়ে সঙ্গী, হ্যা তবে এটা ঠিক যে ওখানে আনন্দ আছে, সহকর্মীদের সাথে মজা করার যথেষ্ঠ সময় পাওয়া যায়, প্রায় একদমে কথাগুলো বলল এ্যাডমন্ড।
আমি বললাম, ব্যবসার কথা বলছিস, সে তো আমি একজনকে দায়িত্ব দিয়েই যাচ্ছি, আর সারা জীবন টাকার পেছনে ছোটার কোন অর্থ হয় না, জীবনটা উপভোগ্য, তাই শেষ জীবনটা আনন্দ ও এ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে কাটাতে চাই। আর তাছাড়া এটাও তো একটা অভিজ্ঞতা, তাই তো জানিস ছোটকাল থেকেই আমি অভিজ্ঞতার পেছনে ছুটেছি হন্যে হয়ে। বিভিন্ন দেশ ঘুরেছি শুধুমাত্র ব্যবসার তাগিদে নয়, অভিজ্ঞতার তাগিদেও। ও হ্যা তোকে বলাই হয়নি, আমি একটি বই লিখছি আমার সকল অভিজ্ঞতা নিয়ে, ভাবছি তোর সাথে  সমুদ্র ভ্রমন করে এসেই শেষ করব এর কাজ।
বই লিখছিস? এ্যাডমন্ডের দৃষ্টিতে কৌতুহল; ইন্টারেস্টিং তো, তা কি নাম তোর বইয়ের?
বইয়ের নাম হচ্ছে, আমি বললাম, “ওয়ার্ল্ড-আ হাউজ অফ এক্সপেরিয়েন্স।“
জটিল একটি নাম ঠিক করেছিস, একেবারে ইউনিক। নিশ্চয়ই তুই এর সিক্যুয়েল বের করবি?
ধীরে বন্ধু ধীরে, আমি বললাম, প্রথমটিই তো এখনও বের হল না, সিক্যুয়েল তো পরের কথা, হ্যা তবে এ রকমই ইচ্ছা আছে, পৃথিবীটাতো ক্ষুদ্র নয়। এসব কথা থাক এখন, বরং কাজের কথা বল, বল তুই আমাকে নিচ্ছিস কিনা?
তোকে না নিয়ে কি আর আমি পারি, তারপরও বলছি, তুই অনভিজ্ঞ আর তাছাড়া সমুদ্রে কত রকম দূর্ঘটনা ঘটে, এমনও দিন দেছে পেটে কিছু পড়েনি দিনরাত হাড়বাঙ্গা পরি‌শ্রম করতে হয়েছে, হাঙ্গরের মুখ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে, তিমির সাথে লড়াই, নৌকা উল্টানো, সব মিলিয়ে আমাদের জীবনের কোন সিকিউরিটি নেই। এখন তুই ঠিক কর যাবি কিনা?
আমি বুঝেছি বন্ধু, তারপরও  আমি যেতে চাই, রক্তের টানেই যাব কারন বাবার রক্ততো আমার দেহে বইছে।
বুঝেছি বুঝেছি আর বলতে হবে না-তোকে আর কোনভাবেই আমি আটকাতে পারব না। ঠিক আছে তাহলে আগামী সোমবারের জন্য তৈরী থাক। কিছু জিনিস কিনতে হবে সেটা আমি লিখে দেব আর সবার আগে প্রয়োজন ভাবীর অনুমোদন, সেটা পাওয়া গেলে আমি মনে করি আর কোন বিপদ নেই।
আমি বললাম, আমার কথার উপর এই ঘরের কেউ কখনও কথা বলেনি, আশা করি এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না, তুই নিশ্চিত থাকতে পারিস, তোর ভাবি অনুমোদন দেবে। ঝামেলা হচ্ছে বাচ্চাদের নিয়ে। ওদেরও অবশ্য ম্যানেজ করতে পারব। সুতরাং এভরিথিং উইলবি ওকে।
আমরা এখন জাহাজে। গতকাল রোববার এ্যাডমন্ডের কথা মোতাবেক সকল জিনিসপত্র কিনেছি, যেমন : স্লিপিং ব্যাগ, রেসকিউ ব্যাগ, একটি ফার্স্ট এইড কিট বক্স সঙ্গে প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র, একটি রাবার ব্যাগ ইত্যাদি।
এরমধ্যে সবাই এসে পড়েছে। প্রথমেই আমরা দেখা করলাম জাহাজের ক্যাপ্টেন মি. কেট বন্ডের সাথে। ভদ্রলোকের অমায়িক ব্যবহার আমাকে অবাক করল। আমি শুনেছিলাম জাহাজের ক্যাপ্টেনরা তাদের কর্কষ ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত, আর এখানে দেখছি তার উল্টো।
এ্যাডমন্ড আমার কথা ওনাকে বলতেই উনি রাজি হয়ে গেলেন তবে প্রথমে আমাকে এ্যাডমন্ডের মত বিপদের কথা শোনালেন, যখন দেখলেন যে আমি অটল তখন আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, মি. পলিন আপনার মত একজন সাহসী লোককে জাহাজে পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত, আমি নিশ্চিত আপনি অনেক সুনাম অর্জন করবেন।
আমি ওনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানালাম।
এরপর আমি একে একে পরিচিত হলাম জাহাজের সকলের সাথে। এরা হলেন, সহকারী ক্যাপ্টেন মি. জোহান সুইট, ফার্স্টমেট মি. সলোমন করিম, সেকেন্ড মেট মি. ডাবরি ক্লিমসন, থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল, ডাক্তার মি. হেনরি ক্লিমসন, আবহাওয়া বিশারদ মি. রবার্ট দ্যান, মৎস বিজ্ঞানী মি. এ্যালবার্ট বব, হারপুনার মি. বিলি মেন, মি. জি ওলমার্ট, মি. ব্রুক ফর্স, মি. সার্প, কামার মি. টম ব্যরন, মি. ডক ক্যালমিন, বাবুর্চি মি. টম হাসিল, বাবুর্চি সহকার মি. ব্রুস অর্চিন। এছাড়াও পাঁচজন নাবিক মি. ডন উইলিয়াম, মি. টমাস কেট, মি. উইল ডায়াজ, মি রোজার স্টোন ও মি. হুয়ান কিম। আরও রয়েছে বিশজন জাহাজী। সকলেই আমার সাথে বেশ আন্তরিক ব্যবহার করল। আমি, এ্যাডমন্ড, মি. হেনরি ক্লিমসন ও মি. এ্যালবার্ট বব পেলাম একটি কেবিন-শোয়া ও বিশ্রামের জন্য।
সোমবার রাতটা আমরা জাহাজেই থাকলাম কারন মঙ্গলবার আমাদের যাত্রা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। রোববার অবশ্য থেকেছিলাম “দ্য কেভ অব হ্যাভেনে”। এঞ্জেলার বাবা মি. বাক্নার আমাদের যথেষ্ট আরামের সু ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার মধ্য সকালের দিকে আমরা জেটি থেকে জাহাজের নোঙর ছাড়ালাম। আমাদের জাহাজের কাঠামো অত্যন্ত নিরেট, ওক কাঠের তৈরী খোল এবং এজ ধরে বসানো হয়েছে মজবুত সংকর ধাতুর পাত। জাহাজের মাঝখানে অফিসার্স কোয়ার্টার। ডেকের সামনে একটি প্রকান্ড হোল তাতে চরবি, কলিজা ইত্যাদি রাখার বিভিন্ন খোপ। হোলটি ঢাকনা দ্বারা ঢাকা থাকে।জাহাজে বারটি হোয়েল বোট এবং পযার্প্ত পরিমানে রসদ রয়েছে। এ্যাফট বা জাহাজের পেছনদিকে রয়েছে রান্নাঘর, ফায়ারপ্লেস, স্তুপাকৃতি ব্যারেল ও গুদাম।
আমাদের জাহাজ চোদ্দ নট গতিতে চলতে সক্ষম। যথেষ্ট শক্তিশালী ইঞ্জিন।
দিনটি চমৎকার ছিল। জাহাজ জেটি ছেড়ে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। জেটিতে প্রায় পঁচিশটি জাহাজ নোঙর করা ছিল, ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে প্রকৃতি হয়ে উঠেছিল উদ্দম, দূর আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল অগনিত অ্যালবাট্রস ও আরও অনেক নাম না জানা মাছখেঁকো পাখি। সূযর্য়ের প্রতিবিম্ব পানিতে পড়েছিল-তাকাতেই চোখ ঝলসে দিতে চাইল।
অনেকদূরে ডলফিনের একটি দল চোখে পড়ল যারা সমুদ্রের নোনা পানিতে ঝাপাঝাপিতে মত্ত ছিল। আমাদের সামনে ও পেছনে ছিল মোট সাতটি জাহাজ। তন্মধ্যে পাঁচটি তিমি শিকারী, একটি নেভির ও একটি সওদাগরী জাহাজ ছিল।
আমাদের জাহাজের নামটিই এখনও বলা হয়নি। জাহাজের নাম ছিল “হোয়েল এক্সপ্রেস”।
পানি কেটে কেটে চলছে জাহাজ। আমি আর এ্যাডমন্ড ডেকে দাড়িয়ে আছি সঙ্গে ডাক্তার সাহেব। নানটুকেট জেটি ক্রমেই ছোট হতে হতে বিন্দুরূপে আমাদের চোখে ধরা দিচ্ছে।
দেখতে দেখতে দিনটি কেটে গেল। রাতে আমাদের কেবিনে জম্পেস আড্ডা হল। আমি শোনালাম আমার দেশ ভ্রমনের অভিজ্ঞতার কাহিনী, এ্যাডমন্ড শোনাল তার বিয়ের ঘটনা, ডাক্তার সাহেব জানালেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক চমকপ্রদ ঘটনা ও তথ্য, মৎস বিজ্ঞানী মি. বব জানালেন বিভিন্ন মাছের স্বভাব ও আত্মরক্ষার কৌশল, সাথে চলল শুকনো মাটন কাবাব ও ব্র্যান্ডি। আমি অবশ্য ব্র্যান্ডি নিলাম না, লেমোনেড দিয়ে চালিয়ে নিলাম ব্র্যান্ডির কাজ। ডাক্তার সাহেব বললেন, আরে খাও (উনি এতটাই মিশুক যে একদিনের মধ্যে উনি আমাকে ওনার ছোট ভাই বানিয়ে ফেলেছেন, আর তাই আমাকে তুমি করে সম্বোধন করেন) মাঝেমধ্যে এক আধটু ব্র্যান্ডি গলায় ঢালতে হয়-জানোতো এটা হার্টের জন্য বিশেষ উপকারী। আমরা সাধারনত হার্ট এ্যাটাক হলে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে বা ট্যাবলেট জিহবার নীচে দেই কিন্তু ব্র্যান্ডি দিয়েও এই কাজ করা যায়। তিনি আরও জানালেন, জন্তুর তেল আমাদের হার্টের বারোটা বাজালেও মাছের তেল হার্টের উপকার করে।
আমি মি. ববকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা স্যার আসলে আমরা যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছি অর্থাৎ সেই মাছটি সম্পর্কে বিশদভাবে যদি কিছু বলতেন, এ্যাডমন্ডের মুখে ভাসাভাসা ভাবে আমি কিছু তথ্য শুনেছি এই যা, আপনি বুঝিয়ে বললে হয়ত বুঝতে পারব।
আপনাকে ধন্যবাদ(এটা মি. ববের একটা স্বভাব, কথা শুরু করার আগে বলেন, “ভালো”, আর কোন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলেন “আপনাকে ধন্যবাদ”, ভদ্রলোকের দৈহিক উচ্চতা হবে পাঁচফুট সাত, দৈহিক গঠন স্বাভাবিক, মোটা লেন্সের চশমা চোখে, চুল ঝুলফির কাছে পাক ধরেছে, ভ্রু টেনে টেনে কথা বলেন, কথাবার্তা ও চালচলনে অভিজাত্য প্রকাশ পায়- অন্যদিকে ডাক্তার সাহেব যেন ঠিক তার উল্টো, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মাঝারি সাইজের উস্কোখুস্কো চুল, অধিকাংশতেই পাক ধরেছে, কথায় নিখুত আমেরিকান টান, সবসময় হেসে হেসে কথা বলেন তবে কেউ ওনার কথা না শুনলে রাগে থরথর করে কাঁপেন, এটাও বোধহয় একধরনের সৌজন্যবোধ কারন এর কিছুক্ষন পরেই তিনি স্বাভাবিক হয়ে যান, চোখে মায়াবী চাহুনি, ভ্রু জোড়া পরস্পরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত, চিকন করে ছাড়া গোফ, সামনের উপরের পাটির বামপাশের প্রি-মোলার দাত ভাঙ্গা, ঠিক ভাঙ্গা নয় বলতে গেলে ফাটা, এটারও অবশ্য একটা ঘটনা রয়েছে যা পরবর্তীতে শুনেছিলাম, সে কথায় পরে আসছি)
আসলে, মি. বব বলতে শরু করলেন, আমরাও এটা সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না, শুধু কয়েক মিনিটের জন্য এর টেলিস্কোপিক ছবি দেখেছিলাম এবং এ থেকেই আমরা এর বৈশিষ্ট সম্পর্কে কিছু ভবিষ্যৎবানী করেছিলাম। তা হচ্ছে প্রানীটি দেখতে নীল তিমির চেয়ে বড় বা ছোট হতে পারে তবে তা অবশ্যই একটি পূর্ন বয়স্ক নীল তিমির সমান। মাথাটি হুবহু ডলফিনের মত চোখা এবং মাথার উভয় পাশে হাঙ্গরের মত পাঁচটি করে ফুলকারন্ধ্র রয়েছে। লেজ হেটারোসার্কাল অর্থাৎ তারকার দু’মাথার মত না হয়ে গাছের শাখার মত লম্বা যেটা কিনা হাঙ্গরের বৈশিষ্ট্য। প্রানীটির সম্পূর্ণ দেহ আঁইশে আবৃত ,অথচ হাঙ্গরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আঁইশ প্লাকয়েড। প্রানীটি তিমির মত পানির ফোয়ারা ছিটাতে পারে এবং দেহে হাঙ্গরের মত পাখনা রয়েছে। মাথাটা সম্পূর্ণ কালো, পিঠ ধূসর এবং পেট সাদা। এর লেজ কালো ও সাদার মিশ্রনে ডোরাকাটা অনেকটা জেব্রার মত। প্রানীটি সারফেসে উঠতে পছন্দ করে না কারন ঐ দিনের পর একে আর দেখা যায়নি-ঠিক কি কারনে ঔ দিন সে সারফেসে উঠেছিল সেটা আমাদের কাছে অজানা কারন আমরা টেলিস্কোপে তার দৈহিক অবস্থার কোন ধরনের ডিফিক্ট সনাক্ত করতে পারিনি। অর্থাৎ এর মূল গঠনটি হচ্ছে এ রকম-ডলফিনের মাথাটি এসে তিমির দেহের সাথে মিশেছে সাথে যোগ হয়েছে হাঙ্গরের ফুলকারন্ধ্র, সবশেষে যোগ হয়েছে হাঙ্গরের লেজ। আশ্চযের ব্যাপার কি জানেন, প্রানীটির দেহে পযার্প্ত পরিমান আঁইশ থাকলেও আমরা ফুলকারন্ধ্র সনাক্ত করতে পেরেছি। বলতে গেলে বলতে হয়, হাঙ্গর-তিমি-ডলফিন আর আঁইশওয়ালা মাছের সংকর এটি। আশ্চয্য বরই আশ্চযের ব্যাপার। আমার এত বছরের শিক্ষা, শিক্ষকতা ও গবেষনা জীবনে এমন প্রানীর কথা ভাবতেই পারিনি, এ যেন কল্পনা। জায়ান্ট, বিগ জায়ান্ট, অড জায়ান্ট, স্ট্রেঞ্জ জায়ান্ট এন্ড ওয়ান্ডারফুল জায়ান্ট। মি. ববের বক্তব্য শেষ হল।
সত্যিই আশ্চয এক প্রানী, ডাক্তারসাহেব মন্তব্য করলেন। আমিও ওনার সাথে মাথা নাড়ালাম।
স্যার, আমি আর এ্যাডমন্ড প্রানীটির বিবর্তনের ব্যাপারে কিছু আলোচনা করেছিলাম। আপনার এবং ডাক্তার সাহেবের আগ্রহ থাকলে আমি সেগুলো শোনাতে পারি। মি. বব এবং ডা. ক্লিমসন উভয়েই শোনতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
ও হ্যা, আরেকটি ব্যাপার পাঠকদের জানানো হয়নি, যদিও পাঠকরা হয়ত কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছেন তা হল, ডাক্তার মি. হেনরি ক্লিমসন এবং সেকেন্ড মেট মি. ডাবরি ক্লিমসন ভাই। মি. হেনরি বড় আর মি. ডাবরি ছোট। মি. হেনরি এই জাহাজে ডাক্তার হিসেবে আছেন ত্রিশ বছর আর মি. ডাবরি জাহাজে আছেন বার বছর ধরে। মি. ডাবরি অবশ্য প্রথমে শিক্ষানুবিশ হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন, পরে থার্ড মেট এবং তারপর পদোন্নতি হয়ে সেকেন্ড মেট হয়েছেন। ভদ্রলোক বিয়ে করেছেন মাত্র তিনমাস হল। যাই হোক, আমি ওনাদের অর্থাৎ ডাক্তার সাহেব ও মি. ববকে আমার আর এ্যাডমন্ডের আলোচনা শোনালাম।
মি. বব বললেন, আমাদের ধারনার সাথে আপনাদের ধারনা প্রায় মিলে যাচ্ছে। তবে এটা ইউনিক প্রজাতী বা দুর্লভ প্রজাতীও হতে পারে কারন প্রতিনিয়তই বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন প্রানীর সন্ধান পাচ্ছেন যারা প্রাকৃতিক এবং কোন ধরনের সংকর প্রজাতি নয়। তারমানে হচ্ছে এই যে, প্রানীটি কোন সংকর প্রজাতি হতে পারে অথবা কোন বিবর্তনের ফলে অথবা নতুন প্রজাতি হতে পারে যা এখন পযর্ন্ত অনাবিষ্কৃত। আপনারা কি বলেন?
ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনি যেভাবে কিং চেক দিয়েছেন তাতে আমার আর কি বলার আছে বলুন, কি বল জোসেফ?
নির্ভূল, আমি বললাম।
রাতের খাবারের পর একবার ক্যাপ্টেন মি. কেট বন্ডের সাথে দেখা করলাম। হাসিখুশি চেহারা, আধাপাকা দাড়ি গলা অবধি নেমে এসেছে, চুল প্রায় সব পেকে গেছে-তবে উনি কলপ ব্যবহার করেন, গোফ ছাটা, নিখুত আচড়ানো চুল, হাতে সবসময় দামি ঘরি পড়েন, আয়ত চোখ-শীতল দৃষ্টি, পাতলা ভ্রু, সব মিলিয়ে চেহারাতে কেমন যেন একটা গাম্ভীয্য চলে এসেছে, কথায় স্প্যানিশ টান (জন্মের ব্যাপারে ওনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি হেসে বলেন, ‘আমার জন্ম সমুদ্রের মাঝে, জাহাজে।‘ আর ভাষায় স্প্যানিশ টানের কথা জিজ্ঞেস করায় উনি বলেন, ‘আমি যৌবন পার করেছি স্পেনে।‘) ঢিলে ঢালা পোশাক পড়েন আর ভদ্রলোকের আন্তরিক ব্যবহারের কথাতো আগেই বলেছি। ওনার রুমে যেতেই উঠে দাড়িযে আন্তরিকবাবে হাত মেলালেন (ভদ্রলোক খাটে বসা ছিলেন-হাতের ডায়েরিতে কি সব আঁকিবুকি করছিলেন।)
তারপর মি. পলিন, কেমন কাটল আমাদের জাহাজে আজকের দিনটা? মি. বন্ড জিজ্ঞেস করলেন হাসিমুখে।
অসাধারন, আমি বললাম, আপনার ক্রুরা সকলেই বেশ আন্তরিক। সত্যি কথা বলতে কি, আমি জীবনে অনেক সামুদ্রিক কাহিনী সম্বলিত বই পড়েছি, অনেক নাবিক ক্যাপ্টেনের সাথে আমার পরিচয় আছে তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক লোকের আচরনেই আমি আন্তরিকতা দেখেছি। অথচ এই জাহাজে এত ক্রু আর সকলেই আন্তরিক-ব্যাপারটি আমার কাছে বেশ আশ্চয লাগছে।
মি. বন্ড আবার হাসলেন, বললেন, আসলে ঘটনা হচ্ছে, আমি সকলকে আনন্দের মধ্যে রাখি। যেমন, প্রতি মাসে একবার করে সকলে ভোজনসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালনের জন্য একত্র হয়, তখন জাহাজ নোঙর করা থাকে, আর যখন ডাঙ্গায় থাকি তখনতো যে যার ইচ্ছে মত আনন্দ করে। যার ফলে ক্রুরা সকলেই উজ্জীবীত থাকে, কাজে ফাঁকি দেয় না। মি. বন্ড এই বলে থামলেন তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, বয়স হয়েছে যার ফলে চাকুরি ছাড়ার জন্য আবেদন করেছিলাম, উদ্দেশ্য বাকী জীবনটা ছেলেমেয়ে নাতিনাতনীদের সাথে কাটাব। সারা জীবনে এ্যাডভেঞ্চার ও টাকা পয়সা তো আর কম আয় করলাম না। কিন্তু বোর্ড সরাসরি রিফিউজ করল। বলল, আপনার যতদিন চলার মত সমর্থ আছে ততদিন জাহাজে থাকবেন, প্রয়োজনে আপনার বেতন দ্বিগুন করা হবে, আর আপনি গেলে ক্রুরা সবাই চলে যাবে।
মি. বন্ড দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, আমার জাহাজ ও ক্রুদের কৃতিত্বের কথা শুনে থাকবেন, বোর্ড ঠিকই বলেছে, আমি চলে গেলে ওরাও সবাই চলে যাবে, কেউ কেউ হয়ত এই পেশাই ছেড়ে দেবে, এসব ভেবে আর যেতে পারলাম না। অবশ্য আমার বেতন দ্বিগুন করা হয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে তো আর ভাবিনা। যাক অনেক কথা বললাম। এখন আপনার কথা বলুন।
আমি হাসলাম, বললাম, আমি যদি আদৌ কোন বই বের করি আর তা যদি কোন গল্প হয় তাহলে সেই গল্পের নায়ক আপনি হবেন। সত্যিই স্যার, আপনার এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কোন তুলনা হয় না। বোর্ড যে আপনাকে ছেড়ে দেয়নি আমার মনে হয় তারা কোন ভুল করেনি, তা না হলে তারা অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলত। অন্তত আমার যা ধারনা। যাই হোক অনেক রাত হল, আজ যাই স্যার, শুভরাত্রি।
মি. বন্ড বললেন, আপনার সাথে কথা বলে যারপরনাই ভালো লাগল, আপনি আবার আসবেন, আর কালতো আবার দেখা হচ্ছে, শুভরাত্রি।
আমি মি. বন্ডের রুম থেকে বেরিয়ে সোজা আমাদের কেবিনে চলে এলাম। দেখলাম ডা. সাহেব এবং এ্যাডমন্ড ইতোমধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে। রুমে অতি অল্প পাওয়ারের একটি বাল্ব জ্বলছে। সেটি না নিভিয়েই আমি শুয়ে পড়লাম।
সকালে ঘুম ভাঙল নাবিকদের হৈ-হুল্লোড়ে। হাতমুখ ধুয়ে ডেক এ উঠে আসলাম। দেখলাম ডা. সাহেব, ক্যাপ্টেন এবং এ্যাডমন্ড রেলিং এর কাছে দাড়িয়ে কথা বলছে। আমি এগিয়ে গেলাম।
এসো এসো, তা ঘুম কেমন হল? ডা. সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
আমি সকলের সাথে হাত মেলাতে মেলাতে বললাম, খুব ভাল বলব না কারন মানুষের ঘুম খুব ভালোর পযার্য়ে পড়ে না, হয়েছে মোটামুটি ভালই।
তোর লেখকী ভাষা এখানেও ব্যবহার করছিস, নাহ তোকে নিয়ে আর পারা গেল না, এ্যাডমন্ড বলল।
ওর কথায় ডাক্তার, ক্যাপ্টেন দু জনেই হেসে ফেললেন।
আচ্ছা, আমি জানতে চাইলাম, এত হৈ হুল্লোড়ের মানে কী?
ও জানোনা তাহলে, ডা. সাহেব বলতে লাগলেন, মি. উইল আজ ক্রোস নেস্ট থেকে একটি তিমি দেখতে পেয়েছেন, কিন্তু আমরা পৌছানোর আগের সেটি হারিয়ে যায়, তবে এটা খুব ভালো লক্ষন। তিমি দেখার খবর শুনেই নাবিকরা চিল্লাচিল্লি শুরু করল।
পাঠক, মি. উইল ডায়াজ একজন নাবিক। তার কাজ হচ্ছে বাতাসের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা এবং ক্রোস নেস্টে বসে থেকে চারপাশে নজর রাখা।
আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আমি বললাম, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কি বলবেন, কি করে আপনার সামনের দাতটি ফেটেছে? এ্যাডমন্ডের কাছে শুনেছিলাম এ ব্যাপারে নাকি একটি চমকপ্রদ ঘটনা রয়েছে।
আমাদের অবাক করে দিয়ে ডা. সাহেব এবং ক্যাপ্টেন একসঙ্গে হেসে উঠলেন। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
ডা. সাহেব অবশেষে বললেন, তাও ভালো যে এটা তুমি জিজ্ঞেস করেছ, অন্য কেউ এটা জিজ্ঞেস করার সাহসই পায় না। যাই হোক, ঘটনাটি একটু মজার আবার একটু বেদনাদায়কও বটে। ঘটনাটির একমাত্র প্রত্যাক্ষদর্শী হলেন আমাদের ক্যাপ্টেন সাহেব। এজন্যই দুজনে একসঙ্গে হেসে উঠলাম।
আজ থেকে প্রায় সাতাশ বছর আগের কথা, ডা. সাহেব বলতে আরম্ভ করলেন, এই জাহাজে উঠেছি তিন বৎসর হয়, তখন এখানকার মৎস বিজ্ঞানী ছিলেন মি. গিলবার্ট ফরেস্ট। ভদ্রলোক যেমনি সম্ভ্রান্ত ছিলেন তেমনি ছিলেন রাগী। তো প্রথম থেকেই আমার সাথে ওনার অনেক ব্যাপারেই মিলত না, কথা কাটাকাটি হত। আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বলছি না, ওসব ব্যাপারের কোনটাতেই আমার দোষ ছিল না, ভদ্রলোক এসেই কথার খোঁচা মারতেন আর আমিও সেটা সহ্য করতে পারতাম না। ব্যস শুরু হয়ে যেত বাকযুদ্ধ। এভাবে চলছিল, হঠাৎ একদিন হল কি…….।
দাড়ান দাড়ান, ক্যাপ্টেন ডা. সাহেব কে থামালেন, বাকিটা আমি বলি। মি. পলিন, ক্যাপ্টেন বললেন, একদিন ডাক্তার ও মি. ফরেস্ট ভোরবেলাতেই বাকযুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, তাদের তর্কের বিষয় ছিল তিমির দুধ গরুর বাচ্চাকে খাওয়ানো যাবে কিনা আর সেটা কতটুকু ফলপ্রসু হবে। মৎস বিজ্ঞানীর মত, খাওয়ানো যাবে না আর ডাক্তারের বললেন, খাওয়ালে ক্ষতি নেই। এভাবে চলছিল, একপযার্য়ে ঝগড়াটি হাতাহাতির রূপ নিল। আমি এসে বাধা দেয়ার আগেই দুজনেই পরস্পরের বিপরীতে ঘুসি বিনিময় করে ফেললেন এবং দুজনের টার্গেট নির্ভূল হয়েছিল। ডাক্তারের প্রি-মোলার দাত না ভেঙ্গে ফেটে গেল আর মি. ফরেস্টের সামনের নীচের একটি দাত ভেঙ্গে গেল। এই ঘটনার পর মি. ফরেস্ট চাকুরী ছেড়ে দিলেন, অবশ্য আমারও সে রকমই ইচ্ছে ছিল, কারন ডাক্তারতো ওনাকে পছন্দ করতেনই না, জাহাজের কোন ক্রুই তাকে পছন্দ করত না, আমি নিজেও না। এর প্রধান কারন সম্ভবত ভদ্রলোকের ঝগড়াটে মনোভাব। এই হচ্ছে ঘটনা। ক্যাপ্টেন থামলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, মি. ফরেস্ট এখন কি করছেন বা কোথায় আছেন?
যতটুকু শুনেছি, ক্যাপ্টেন বললেন, তিনি একটি তিমি শিকারী জাহাজে চাকুরী করেন, সেই জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথে আমার বেশ ভালো জানাশোনা আছে। সেকানে ফরেস্ট সাহেব নাকি এই জাহাজের মতই পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। সেখানে ওনার প্রধান প্রতিপক্ষ জাহাজের আবহাওয়া বিশারদ। যার ফলে চাকুরী সেখানেও যাই যাই করছে। এ নিয়ে কত জায়গায় ওনার চাকুরী গেল তার ইয়ত্তা নেই। তবে লোকটি জ্ঞানী এবং নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, এই বলে ক্যাপ্টেন আড়চোখে ডাক্তারের দিকে তাকালেন।
ডাক্তার সাহেব বললেন, সেটা আমিও অস্বীকার করিনা। ভদ্রলোক আসলেই জ্ঞানী, আমিও তর্কের মাধ্যমে অনেক তথ্য ওনার কাছ থেকে জেনেছি।
ওহহো, মনে পড়ার ভঙ্গিতে ক্যাপ্টেন বললেন, মি. পলিন, আপনি নাস্তা করেছেন?
আমি মৃদু হেসে বললাম, এইতো যাচ্ছি স্যার।
ডাক্তার সাহেব বললেন, চলো আমিও নাস্তা করিনি, দু জন একসাথে করি গিয়ে।
ক্যাপ্টেনকে বিদায় জানিয়ে আমরা কেবিনে ফিরে আসলাম।এ্যাডমন্ড সবে খাওয়া শুরু করেছে। আমাদের দুজনকে দেখে বলল, নাস্তা নিশ্চয়ই করা হয়নি, আজ রুটির সাথে সুস্বাদু ঝিনুকের স্টু ও পনির দিয়ে নাস্তা সাড়তে হবে।
আমি আর ডাক্তার সাহেব এ্যাডমন্ডের সাথে যোগ দিলাম। নাস্তা শেষ করেই আমরা তিনজন আবার ডেকে উঠে এলাম। ক্যাপ্টেন চলে গেছেন,তবে আবহাওয়া বিশারদ মি. রবার্ট দ্যানের সাথে দেখা হয়ে গেল। উনি অনেক দূরের ডলফিনের খেলা দেখছিলেন। ভদ্রলোকের চেহারা অনেক মোলায়েম, হাসিখুশি মুখ এবং জাহাজের অন্য সকল ক্রুদের মত তিনিও সদালাপী ও প্রাঞ্জল।
কত সুন্দর প্রকৃতি তাই না, হাস্যোজ্জল মুখে জিজ্ঞেস করলেন মি. দ্যান।
সত্যিই দারুন, মি. দ্যান, আমি উত্তর করলাম।
রৌদ্রোজ্জল চারপাশ, দু চারটা টুকরো টুকরো মেঘ আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে, অ্যালবাট্রসের দল তাদের বিশাল বিশাল পাখা মেলে দিয়ে উড়ে চলছে, সূযের কিরন সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউয়ে প্রতিফলন ঘটাচ্ছে মনে হচ্ছে যেন হাজারো হাজারো হীরে সমগ্র সমুদ্র ব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সত্যিই, এটাই একটা জগৎ, এটাই একটা পৃথিবী। যারা এই জগতে বাস করে তারা কতইনা সুখী, কতই না নিশ্চিন্ত।
আমরা চারজন নিজেদের পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে আলাপ করছি এমনই সময় হাজির হলেন ত্রিরত্ন। অর্থাৎ ফার্স্ট মেট মি. সলোমন করিম, সেকেন্ড মেট মি. ডাবরি ক্লিমসন, থার্ড মেট মি. ট্রিমিন সয়েল। ওনারা তিনজনেই আমাদের স্বাগত জানালেন। আমরাও প্রত্যুত্তর করলাম। আশ্চযের  ব্যাপার হচ্ছে তিনজন মেট-ই টগবসে যুবক। কারও বয়স তিরিশের বেশি নয়।এত অল্প বয়সে এরূপ দক্ষতা আসলেই প্রশংসনীয়।
মি. সলোমন করিমের চুল বড়, মাথার পেছন দিকে চুল ঘাড় অবদি নেমে এসেছে, কালো রঙের সিল্কি চুল, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, লম্বা জুলফি, সবার্পেক্ষা আকর্ষনীয় হচ্ছে ওনার চোখ জোড়া। চোখজোড়ায় সাবর্ক্ষনীক যেন কোন বুদ্ধি ঝিলিক দিচ্ছে। দৈহিক গঠন মজবুত, পেটা শরীর, মনে হয় প্রতিদিন ব্যায়াম করেন।
মি. ডাবরি ক্লিমসন দেখতে হুবহু ভাইয়ের মত, শুধু বয়সটা একটু কম এই যা। তবে ওনার হিটলারি গোফ নজরে পরার মত।
থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল লম্বা, ছিপছিপে শরীর, শ্যামবর্ণ, সোনালী চুলের উচ্ছল যুবক। সবসময় ক্লিনশেভড। ওনার চোখের দিকে তাকালেও মনে হয় উনিও খুব বুদ্ধি ধরেন। তিনজনেরই বাচনভঙ্গি চমৎকার। তিনজনের সাথে খুব বেশি কথা বলার সময় পেলাম না। শুধু জানলাম শীঘ্রই সুখবর আসতে পারে। জাহাজের পেছনে চলে এলাম আমরা।
বাবুর্চি মি. টম হাসিলের মুখ লালচে আলুর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আগুনের কাছে থাকতে থাকতে মুখে লালচে আভা ধারন করেছে। তবে উনি ফর্সা। একটু বেটে এবং ভুড়িবহুল দেহ। উনি নড়ার সাথে সাথে ওনার ভুড়িটিও নড়ে ওঠে। মাথা ক্লিন শেভড, ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। দাড়ির রং সোনালী। ছোটছোট চোখ। তবে ওনার মুচকি হাসি দেখতে চমৎকার লাগে। আমাদের চারজনের জন্য উনি চমৎকার কফি বানালেন। জানাগেল এগুলো ব্রাজিলিয়ান কফি। কথা বলতে বলতে কখনযে লাঞ্চের সময় হয়ে এল টেরই পেলাম না। লাঞ্চ করলাম চিংড়ী মাছ ভাজা, চিকেন স্যুপ এবং তিমি মাছের দুধ দিয়ে। তিমি মাছের দুধের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, তিমিরা যখন সমুদ্র সারফেসে উঠে ফোয়ারা ছিটায় তখন বোটে করে জাহাজিরা গিয়ে দুধ নিয়ে আসে। এ এক অনন্য স্বাধ। না খেলে বোঝা যাবে না। লাঞ্চের সময় কেন জানি মনে হল আমাদের অভিযান শেষ হতে আর খুব দেরি নেই।
এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিন। জাহাজী, নাবিক তথা ক্রুদের সাথে কথা বলে, আনন্দ ফুর্তি করে উপলব্দি হচ্ছে জীবনটা কতই না উপভোগ্য। একঘেয়েমিয়তা এখানে স্পর্শই করে না। চমৎকার আবহাওয়া, সুস্বাধু খাদ্য, চমৎকার বাসস্থান মোটকথা সবকিছু বিশুদ্ধ। একে একে কেটে গেল তিনটি মাস। টেরই পেলাম না। মনে হচ্ছে এইতো সেদিন এলাম জাহাজে। এখন জাহাজে আমরা কাজ হচ্ছে লেখালেখি করা, ক্রুদের সাথে কথা বলা তাদের জবিনের গল্প ও অভিজ্ঞতার কথা শোনা, প্রকৃতি দেখা, রাতের আকাশের তারা পযবের্ক্ষন করা এবং ক্রুদের সাহায্য করা। এর মধ্যে প্রতিমাসে একবার জাহাজে জলসা হয়। সেটা হয় পূর্নিমার রাতে। জাহাজের ক্রুদের সবাই কিছু না কিছু করে দেখায়। একবারতো হারপুনার মি. জি. ওলমার্ট বাজি ধরে পরপর পাঁচ বোতল রাম সাবার করে দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে নাবিকরা ট্রেজার আইল্যান্ডের সেই বিখ্যাত “মরা মানুষের সিন্দুক” গানটি গেয়ে ওঠে। এই তিনমাসের মধ্যে আমরা অনেক তিমি দেখেছি কিন্তু কোনটির পেছনেই দাওয়া করিনি।কারন আমাদের টার্গেট হচ্ছে “ট্রেঞ্জ ফিস”।
অবশেষে এল সেই দিন। প্রায় সাড়ে পাচ মাসের মাথায় মেঘাচ্ছন্ন একটি দিন। আমরা সবেমাত্র নাস্তা শেষ করেছি এমন সময়ই মি. উইল ডায়াজ ক্রোস নেস্ট থেকে চিৎকার করে উঠলেন। বলতে গেলে তার কন্ঠস্বর কেপে উঠল। জাহাজের সমস্ত ক্রু ডেকে জমা হল।
কি ব্যাপার?
দেখা গেছে, দেখা গেছে, দেখা……………….গে…………ছে, মি. ডায়াজ কোনমতে বলতে থাকলেন, স্যার স্ট্রেঞ্জ ফিস এই মুহূর্তে আমাদের সামনে। মনে হল কথাটি কানে ভুল শুনেছি। ক্যাপ্টেন তড়িঘরি করে ক্রোস নেস্টে উঠে গেলেন। চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে রাখলেন পাক্কা পাঁচ মিনিট ছয় সেকেন্ড। অবশেষে নেমে জাহাজ এখানেই নোঙর করার নির্দেশ দিলেন। আমরাও খালি চোখে দেখতে পেলাম জগতের এযাবত কালের মধ্যে সবার্পেক্ষা অদ্ভুত জীবন্ত জীবটিকে। ক্যাপ্টেন স্যার সাথে সাথে ইউএস নেভির সাথে যোগাযোগ করলেন। তারা মাছটিকে জ্যান্ত ধরার চেষ্ঠা করতে বললেন।
ক্যাপ্টেন জানালেন, এটাকে জ্যান্ত ধরা এক কথায় অসম্ভব। সমস্ত দেহ আঁইশে আবৃত এবং প্রতিটি আঁইশে রয়েছে শতাধিক করে সুক্ষ সুক্ষ তীক্ষ্ণ কাঁটা। স্যাটেলাইটের তথ্যাবলীর সাথে বর্ননা হুবহু মিলে গেল। ইউএস নেভির কাছ থেকে প্রাণীটিকে মৃত ধরার নির্দেশ পাওয়া গেল। হারপুনাররা তাদের হারপুনে ধার দেয়ার তোরজোর শুরু করলেন। ক্যাপ্টেন তো প্রত্যেক হারপুনারের জন্য জনপ্রতি দশ হাজার ইউএস ডলার করে পুরস্কারের ঘোষনা দিলেন যদি কাজটি ঠিকমত সমাধা করতে পারে।
চারজন হারপুনার, ছয়জন জাহাজী, নাবিক মি. উইল ডায়াজ ও মি. হুয়ান কিম, থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েলসহ সবমিলিয়ে ষোলজন লোক চারটি বোটে করে “স্ট্রেঞ্জ ফিস” অভিমুখে যাত্রা করল। হারপুনাররা সদা সতর্ক। এগিয়ে থাকা প্রথম বোটে রয়েছে সবচেয়ে অভিজ্ঞ হারপুনার মি. বিলি মেন। সবাই তার নির্দেশের অপেক্ষা করছে। অবশেষে চারজন হারপুনার একসাথে তাদের অস্ত্র ছুড়লেন। অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ। চারজনের হারপুনই প্রানীটির মাথায় আঘাত করেছে। প্রথম তিনসেকেন্ড কিছুই ঘটল না। তারপর হঠাৎ করেই প্রানীটি সমুদ্র জলে ডুব মারল। হারপুনাররা তাদের হারপুনে কোন ধরনের টানই অনুভব করল না।
সেই যে গেল, গেলই। এই ঘটনার পর আরও ছয়মাস আমরা একে খুঁজে বেড়ালাম। কিন্তু বৃথা। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে আমরা ফিরে চললাম। জেটিতে আমার ছেলেমেয়েরা, তাদের মা, এ্যাডমন্ডের শ্বশুর ও স্ত্রী উপস্থিত ছিল। আমরা সবাই আমার বাড়িতে এসে উঠলাম। বাচ্চারাসহ বড়রা আমাদের দুজনকে ঝেকে ধরল সব শোনার জন্য। আমরাও ধৈয্য ধরে সব শোনালাম। ঘটনার পর আজ প্রায় পাঁচ বছর কেটে গেছে, এর মধ্যে একটি বারের জন্যও আর দেখা যায়নি স্ট্রেঞ্জ ফিসকে। এ্যাডমন্ড ফিরে গেছে সমুদ্রে। ওদের ঘরে এসেছে ফুটফুটে একটি ছেলে। হয়ত সেও বাবার মত তিমির পেছনে ধাওয়া করবে। স্ট্রেঞ্জ ফিসের দেহটি ছিল জেলি ফিসের মত থলথলে তাই হারপুনে কোন টান পড়েনি।

স্মার্ট গ্লাস আনছে ফেসবুক (Google গ্লাসের বিকল্প)

স্মার্ট গ্লাস আনছে ফেসবুক (Google গ্লাসের বিকল্প)
গুগল গ্লাসের মত স্মার্ট গ্লাস তৈরির ঘোষণা দিল ফেসবুক। সম্প্রতি শেষ হওয়ার বার্ষিক ডেভেলপারস সম্মেলন এফ ৮ এ এই ঘোষণা আসে। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ এমনই একটি স্মার্ট গ্লাসের প্রোটোটাইপ প্রদর্শন করেন।
এ সময় জুকবারবার্গ জানান, তার এমন একটি গ্লাস উৎপাদন করতে চায় যেটি দিয়ে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং অগমেন্টেড রিলিয়েটি উপভোগ করা যাবে। এটি গুগল গ্লাসের চেয়ে খুব একটি বৈসাদৃশ্য পূর্ণ হবে না।
জুকারবার্গ বলেন, ‘অগমেন্টেড রিয়েলিটি আপনাকে বিশ্ব দেখার সুযোগ করে দেবে। কিন্তু সেটি হবে বাস্তব জগতের ওপর ভিন্ন প্রলেপ।’ এ যেনো বাস্তবেই কল্পনায় দেখা।

ফেসবুক ছাড়াও অগমেন্টেড টেকনোলজি নিয়ে কাজ করছে মাইক্রোসফট। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে হলোলেন্স তৈরি করেছে। অন্যদিকে স্ন্যাপচ্যাটও এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে গুগলও তাদের স্মার্ট গ্লাসের নতুন ভার্সন বাজারে আনতে কাজ করে যাচ্ছে।
ফেসবুকের এই স্মার্ট গ্লাসের কাজ ঠিক কবে নাগাদ শুরু হবে সে বিষয়ে জুকারবার্গ বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

এক মিনিটে বিশ্বে কী ঘটে

এক মিনিটে বিশ্বে কী ঘটে
বিশ্বে এক মিনিটে কী ঘটে? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা খুবই কষ্ট সাধ্য। তবে এক বার পাশ্চাত্যের একটি ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা এ বিষয়ে জরিপ চালিয়ে দেখেছিলেন। আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ওয়াচ নামে একটি গবেষণা পত্রিকাতে এ জরিপটি প্রকাশিত হয়। জরিপে দেখা যায়:
০১. এক মিনিটে পৃথিবী সূর্যের চার দিকে ১০০০ মিটার পথ অতিক্রম করে।
০২. এক মিনিটে বিশ্বে ৩৮টি ঝড় বয়ে যায়।
০৩. এক মিনিটে বিভিন্ন মহাদেশে ৪০০সে.মি. বৃষ্টিপাত হয়।
০৪. এক মিনিটে বিশ্বে ২৪০০০ টন নদীর মিঠা পানি গিয়ে মেশে সাগরে।
০৫. এক মিনিটে ১০০ জন মানুষ মারা যান।
০৬. এক মিনিটে ১১৪ জন শিশুর জন্ম হয়, এদের মধ্যে ১২জন জমজ।
০৭. এক মিনিটে বিশ্বে ২৮০০০০ টেলিফোন করা হয়।
০৮. এক মিনিটে ধুমপায়ীরা ৬০০০০০০ সিগারেট পান করেন।
০৯. এক মিনিটে বিশ্বে মানুষ ২৯০০০ হেক্টোলিটার পানীয় পান করেন।
১০. এক মিনিটে বিশ্বে মানুষ ৪০০০ টন খাদ্য গ্রহন করেন।
১১. এক মিনিটে বিশ্বে ৪৬০০ জোড়া জুতা তৈরি হয়।
১২. এক মিনিটে বিশ্বে ৮৮ টি গাড়ি তৈরি হয়।
১৩. এক মিনিটে বিশ্বে ৭২ একর বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে।
এখানে দেওয়া হিসেবটি আনুমানিক। এই পোষ্টটি কেউ আগে করে থাকলে দুঃখিত। সূত্রঃ ইন্টারনেট

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এর আগে শেষ উক্তি

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এর আগে শেষ উক্তি
মানুষের কৌতূহল থাকে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তি, দণ্ডিত হওয়ার পরে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পূর্ব মুহূর্তে, কি ভেবেছিলেন ও কি বলেছিলেন, সেটা জানতে।
এ বিষয়ে ইংরেজ লেখক চার্লস ডিকেন্স (১৮১২ – ১৮৭০) তার জনপ্রিয় উপন্যাস এ টেইল অফ টু সিটিজ (A Tale of Two Cities, ১৮৫৯)-এ কল্পনা করেছেন। ফ্রেঞ্চ রিভলিউশনের সময়ে, লন্ডন ও প্যারিস  এই দুটি শহরের প্রেক্ষিতে রচিত এই উপন্যাসের শেষাংশে নায়ক সিডনি কার্টন-এর মৃত্যু হয় গিলোটিনে।
মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে সিডনি কার্টন যে কথাগুলো বলেছিলেন সেটা ডিকেন্সের সাহিত্যকর্মে কালজয়ী হয়ে আছে। এ টেইল অফ টু সিটিজ-এর সূচনায় এবং সমাপ্তিতে যেসব লাইন লেখা হয়েছে সেসব সাহিত্যপ্রিয়দের মুখস্থ। সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রিত (২০ কোটি কপির বেশি) উপন্যাসের অন্যতম হয়েছে বইটি।
এ টেইল অফ টু সিটিজ একটি কল্পিত উপন্যাস। মৃত্যুমুখী সিডনি কার্টনের শেষ কথাগুলো ছিল চালর্স ডিকেন্সের কল্পনা প্রসূত।
কিন্তু বাস্তবে যারা মৃত্যুদণ্ড পেয়ে মৃত্যুমুখী হয়েছিলেন তারা কি ভেবেছিলেন? কি বলেছিলেন?
বিশেষত সেই সব দণ্ডিত ব্যক্তি যারা নিরপরাধী ছিলেন? অথবা নিজেদের নিরপরাধী মনে করেছিলেন?
জেনে নিন, মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত তেত্রিশ ব্যক্তির শেষ কথা। নিচে তাদের উক্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কাল অনুসারে উদ্ধৃত হলো। এরা ছিলেন দার্শনিক, কবি, লেখক, যোদ্ধা, বিপ্লবী যোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা, স্পাই, অর্ডিনারি কৃমিনাল, পলিটিশিয়ান, রাজা-রানি, প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট। এই উক্তিগুলোর অধিকাংশ অনূদিত  সুতরাং মৃত্যুমুখীদের পূর্ণ আবেগের প্রতিফলন এখানে ঘটেনি। উক্তিগুলো :

মৃত্যুর পরিণতি দুটি হতে পারে। এক. মৃত ব্যক্তি পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যেতে পারে  তার কোনো অনুভূতিই থাকবে না। দুই. বলা হয়, একটা বিশেষ পরিবর্তন হবে  আত্মা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবে।
মৃত্যু যদি সকল অনুভূতিকে নিঃশেষ করে দিতে পারে, তাহলে এটা হবে ঘুমানোর মতো, যেখানে ঘুমন্ত ব্যক্তি কোনো স্বপ্ন দেখে না। তাহলে মৃত্যু হবে একটা বড় লাভ … মৃত্যু যদি এ রকমই হয় তাহলে আমি বলব, এটা একটা লাভ। এর ফলে এক রাতের মধ্যে সব ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু, অন্যদিকে, যদি মৃত্যুটি হয় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আত্মার স্থানান্তর এবং যা বলা হয় তা যদি সত্য হয়, তাহলে এর চাইতে বড় আশীর্বাদ আর কি হতে পারে, বিচারকবৃন্দ? এটা আমার কাছে পরিষ্কার যে, এখন মরলে এবং সব যত্নআত্তি থেকে মুক্ত হলে, আমার জন্য ভালো হবে … কিন্তু এখন যাওয়ার সময় হয়েছে, আমার মৃত্যুর সময় হয়েছে … আপনারা বেচে থাকবেন। কিন্তু আমি, নাকি আপনারা  কে যে ভালো জায়গায় থাকবেন, সেটা ঈশ্বর বাদে কেউ জানেন না। (… it is now time to depart, for me to die, for you to live. But which of us is going to a better state is unknown to everyone but God.)
সক্রেটিস (Socrates,, খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৯ – ৩৯৯)। গৃক দার্শনিক। ৭০ বছর বয়সে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তরুণ সমাজকে বিপথগামী করার অভিযোগে। সামান্য অর্থদণ্ড দিয়ে মুক্তির সুযোগ তাকে দেওয়া হয়েছিল। তিনি সেটা নাকচ করে দেন। জেলখানা থেকে পালানোর সুযোগও তাকে দেওয়া হয়েছিল। তিনি সেই সুযোগ নেননি। ক্রন্দনরত ভক্তদের সামনে রায় অনুযায়ী তিনি নিজের হাতে হেমলক বিষ খেয়ে মারা গিয়েছিলেন।

আহ রুয়ে। আমার খুব ভয় হচ্ছে, আমার মৃত্যুর ফলে তোমাকে কষ্ট ভোগ করতে হবে।
… যিশু, যিশু …
জোন অফ আর্ক (Joan of Arc, ১৪১২ – ১৪৩১)। ফ্রেঞ্চ দেশপ্রেমিক এবং সর্বকালের বিস্ময়কর নারীদের অন্যতম। পুরুষের বেশে তিনি সুকৌশলী ও বীর যোদ্ধা রূপে ১৪২৯-এ অরলিয়ন্সে ইংরেজদের পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু পরে এক যুদ্ধে তিনি ধরা পড়েন এবং ইংরেজরা তাকে ধর্মীয় ভিন্নমত প্রচারের কারণ দেখিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ফ্রান্সে রুয়ে শহরে আগুনে পুড়িয়ে তাকে ১৯ বছর বয়সে হত্যা করা হয়।


আমার দেহের এই অংশটি কখনোই দেশদ্রোহিতা করেনি।
স্যার টমাস মোর (Sir Thomas More, ১৪৭৮ – ১৫৩৫)। মানবতাবাদি ইংরেজ চিন্তাবিদ। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরিকে চার্চের নেতা রূপে মানতে রাজি না হওয়ায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। মাথা পেতে দেওয়ার সময়ে গিলোটিনের পথ থেকে নিজের দাড়ি সরিয়ে রেখে তিনি ওপরের কথাটি বলেছিলেন।


গুড কৃশ্চিয়ান ভাই ও বোনেরা, আমি এখানে এসেছি মরতে। আইন অনুসারে এবং আইনের বিচারে আমাকে মরতে হবে। তাই এর বিরুদ্ধে আমি কিছু বলব না। আমি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করব না। যে কারণে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধেও আমি কিছু বলব না। কিন্তু আমি প্রার্থনা করি ঈশ্বর যেন রাজাকে দীর্ঘজীবী করেন। তিনি যেন দীর্ঘকাল আপনাদের ওপর রাজত্ব করতে পারেন। কারণ, তার চাইতে ভদ্র এবং দয়ালু রাজা আর কেউ ছিলেন না। আমার কাছে তিনি ছিলেন সবসময়ই ভালো, ভদ্র এবং আমার রাজা। যদি কেউ আমার কথা নিয়ে ভাবতে চান, তাহলে আমি তাকে অনুরোধ করব সুবিচার করতে। এ কথা বলে আমি পৃথিবী থেকে এবং আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমি সর্বান্তকরণে চাই আপনারা আমার জন্য প্রার্থনা করবেন। ঈশ্বর আমার প্রতি করুণা করুন। আমার আত্মা আমি ঈশ্বরকে সমর্পণ করছি। ওহ গড, আমার প্রতি করুণা করুন … ওহ গড, আমার প্রতি করুণা করুন …
অ্যান বলিন (Anne Boleyn, ১৫০১ অথবা ১৫০৭ – ১৫৩৬)। ইংল্যান্ডের রানি। তিনি ছিলেন রাজা অষ্টম হেনরির দ্বিতীয় রানি। হেনরি তাকে ডিভোর্স দেন। কারণ, তিনি পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে পারছিলেন না। হেনরি তার বিরুদ্ধে মিথ্যা পরকীয়ার অভিযোগ আনেন। কুঠারাঘাতে অ্যান বলিনের মৃত্যুদণ্ড হয়। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে (২৮ অথবা ৩৫ বছর বয়সে) মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে অ্যান বলিন কথাগুলো বলেছিলেন। মৃত্যুর আগের দিন তিনি বলেছিলেন, শুনেছি আমার জল্লাদ একজন এক্সপার্ট। আমার গলা বেশ সরু।
পুত্র সন্তানের জন্ম না দিতে পারলেও অ্যান বলিনের কন্যা হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের পরম প্রতাপশালী রানি প্রথম এলিজাবেথ। ঐতিহাসিকরা বলেন, মৃত্যুর আগে অ্যান বলিন তার স্বামীর সম্পর্কে ভালো ভালো কথা বলেছিলেন, কারণ, তিনি চেয়েছিলেন, অষ্টম হেনরি যেন তার কন্যা এলিজাবেথের প্রতি ভালো আচরণ করেন।


কোপ মারো ব্যাটা, কোপ মারো।
স্যার ওয়ালটার র‌্যালে (Sir Walter Raleigh, ১৫৫২ – ১৬১৮)। ইংল্যান্ডের নৌ বাহিনীর কমান্ডার ও কবি। যে কুঠারের আঘাতে তার শিরñেদ করা হবে সেটা দেখে তিনি বলেছিলেন, এটা একটা কড়া ওষুধ  কিন্তু সকল রোগ ও দুঃখের জন্য এটা একজন ডাক্তার। … আমি চাই না আমার শত্রুরা ভাবুক মৃত্যুর ভয়ে আমি কুকড়ে গিয়েছিলাম।
তার ঘাতককে দ্বিধাগ্রস্ত দেখে তিনি বলেছিলেন, Strike man, strike.


দুর্নীতিগ্রস্ত স্থান থেকে আমি চলে যাব এমন একটি স্থানে যেখানে দুর্নীতি নেই। যেখানে কোনো অশান্তি হতে পারে না।
প্রথম চার্লস (Charles I, ১৬০০ – ১৬৪৯)। ইংল্যান্ডের রাজা। রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ইংল্যান্ডে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী বিপ্লবী দলের কাছে পরাজিত হয় প্রথম চার্লসের সেনাবাহিনী। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে প্রথম চার্লসকে কুঠারাঘাতে শিরচ্ছেদের দণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
মৃত্যুর আগে ওপরের উক্তিটি করেছিলেন প্রথম চার্লস।
সাময়িকভাবে ইংল্যান্ডে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন বিপ্লবী নেতা অলিভার ক্রমওয়েল (১৫৯৯ – ১৬৫৮)। ম্যালারিয়া রোগাক্রান্ত হয়ে ৫৯ বছর বয়সে ক্রমওয়েলের মৃত্যুর পরে রাষ্ট্রীয় সম্মানের সঙ্গে তাকে কবর দেওয়া হয়। কিন্তু দুই বছর পরে ১৬৬০-এ ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র ফিরে আসে। নতুন রাজা হন দ্বিতীয় চার্লস। ১৬৬১-তে রাজা প্রথম চার্লসের দ্বাদশ মৃত্যু বার্ষিকীতে ক্রমওয়েলের দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে তাকে ফাসি দেওয়া হয়েছিল। চূড়ান্ত বিচারে অবশ্য ক্রমওয়েলই বিজয়ী হয়েছেন। কারণ, কালক্রমে ইংল্যান্ডে তথা বৃটেনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, যেখানে রাজা-রানির ক্ষমতা খুবই সীমিত। ক্রমওয়েলের একটি মূর্তি স্থাপিত হয়েছে পার্লামেন্ট ভবনের দোরগোড়ায়। ঘোড়ার পিঠে বসা ক্রমওয়েলের সেই মূর্তিটি দেখে সবাইকে পার্লামেন্টে ঢুকতে হয়।


আমার মৃত্যুকে আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু যেভাবে মরতে হবে সেটা আমি ঘৃণা করি … এটা হবে মাত্র এক মুহূর্তের ব্যথা। আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, আমার মৃত্যু যেন হয় সাহসী মানুষের মতো।
জন আনদ্রে (Jhon Andre, ১৭৫০ – ১৭৮০)। বৃটিশ মেজর। এই চিঠি তিনি লিখেছিলেন জেনারেল হেনরি ক্লিনটনের কাছে। স্পাইয়িংয়ের জন্য তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল এবং তিনি ফাসিতে মরতে চেয়েছিলেন। তার অনুরোধ উপেক্ষিত হয়েছিল।


আমার মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের ক্ষমা করে দিচ্ছি।
ষোড়শ লুই (Louis XVI, ২৩.০৮.১৭৫৪ – ২১.০১.১৭৯৩)। ফ্রান্সের রাজা। ফ্রেঞ্চ রিভলিউশনের গিলোটিনে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে তিনি কথাগুলো বলেছিলেন।


মাফ করবেন স্যার, আমি এটা করতে চাইনি।
মারি এন্তনে (Marie Antoinette, ২.১১.১৭৫৫ – ১৬.১০.১৭৯৩)। ফ্রেঞ্চ রিভলিউশনে নিহত ফ্রান্সের সম্রাট ষোড়শ লুই-এর স্ত্রী। সুন্দরী ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ মারি এন্তনে-র জন্ম হয়েছিল অস্টৃয়াতে। ষোড়শ লুইয়ের সঙ্গে বিয়ের পর তিনি হন ফ্রান্সের কুইন কনসর্ট। প্রথমে ফ্রেঞ্চ জনগণের প্রিয় হলেও পরে তার অমিতব্যয়িতা এবং বহু-গামিতার জন্য অপ্রিয় হন। এটাও কথিত আছে যে, ফ্রান্সে খাদ্যাভাব দেখা দিলে তিনি বলেছিলেন, ওরা (জনগণ) কেক খেয়ে বাচুক (Let them eat cake)। পরবর্তী কালে প্রমাণিত হয়, এ ধরনের কোনো উক্তি তিনি করেননি। তবে অলংকার, পোশাক, জুয়া, ঘোড়দৌড় বাজি, প্রভৃতিতে তার অঢেল খরচের কাহিনী বিস্তৃত হয়। কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, তার জন্যই ফ্রান্স ফকির হয়ে গিয়েছিল ও তার ফলে বিপ্লব সূচিত হয়েছিল। বিপ্লবে ষোড়শ লুইয়ের শিরচ্ছেদের পর মারি এন্তনে-র বিচার ও মৃত্যুদণ্ড হয়। বহু অভিযোগের মধ্যে অন্যতম ছিল তার পুত্রের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন। বিচারের সময়ে প্রথমে এন্তনে (৩৭) নিশ্চুপ এবং ধীরস্থির ছিলেন। কিন্তু ওই অভিযোগের পরে তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলেন, কোনো মা-র বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করা হলে প্রকৃতিও তার উত্তর দেবে না।
গিলোটিনে মৃত্যুর আগে তিনি অসতর্কতাবশত জল্লাদের পা মাড়িয়ে মঞ্চে উঠেছিলেন। তাই তিনি জল্লাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন, পার্ডন মি স্যার, আই মেন্ট নট টু ডু ইট (Pardon me Sir, I meant not to do it)। মারি এন্তনে-র জীবনী নির্ভর বহু উপন্যাস, কাহিনী, নাটক ও মুভি রচিত হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এর আগে শেষ উক্তি

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তি


১০
আমার একমাত্র দুঃখ যে, ওই ইদুরটা, রোবেসপিয়েরের আগে আমাকে যেতে হচ্ছে … আমার মাথা জনগণকে দেখাতে ভুলো না  এটা দেখার মতো জিনিস।
জর্জ জ্যাক দান্তো (Georges Jacques Danton, ১৭৫৯ – ১৭৯৪)। ফ্রেঞ্চ রিভলিউশনের অন্যতম নেতা। কৃষক পরিবারে দান্তো-র জন্ম হয়েছিল। সুবক্তা দান্তো ছিলেন লম্বা, চওড়া, সুদর্শন এবং তার ছিল বজ্রকণ্ঠ। জ্বালাময়ী ভাষনে তিনি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন। ১৭৮৯-এ সূচিত ফ্রেঞ্চ রিভলিউশন বা ফরাশি বিপ্লবের পরে তিনি নতুন প্রজাতন্ত্রের বিচারমন্ত্রী হয়েছিলেন। ফ্রেঞ্চ রিভলিউশনের এক পর্যায়ে ১৭৯৩-তে দি রেইন অফ টেরর (The Reign of Terror) নামে ভয়ের শাসনকাল শুরু হয়ে যায়। তখন বিপ্লবের নামে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষকে গিলোটিনে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। অন্যায় বিচারে নির্দোষ মানুষকে হত্যার প্রতিবাদ দান্তো করলে নিজের বিপদ ডেকে আনেন। তার বিপ্লবী সহযোগী ম্যাক্সমিলিয়ন রোবেসপিয়ের আরো ক্ষমতাশালি হয়ে ওঠেন এবং বিপ্লব নস্যাৎ চেষ্টার অভিযোগে দান্তো-কে গ্রেফতার করেন। দান্তোর বিচার দুই দিন ধরে চলে। কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনে তার আবেগময় বক্তৃতায় জনগণ আপ্লুত হয়। রোবেসপিয়ের তার প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। দান্তোকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ৫ এপৃল ১৭৯৪-এ মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে দান্তো (৩৪) তার মাথা জনগণকে দেখানোর জন্য জল্লাদকে বলেছিলেন। তার মৃত্যুর পর মাথা কেটে মানুষকে দেখানো হয়েছিল।
সাধারণ মানুষ মৃত দান্তোর পক্ষে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা চক্রান্তকারী রোবেসপিয়েরের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। চাকা ঘুরে যায়। রোবেসপিয়েরকে ধরে তার বিচার করা হয়। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২৮ জুলাই ১৭৯৪-এ, অর্থাৎ দান্তোর মৃত্যুর ১১৪ দিন পরে রোবেসপিয়েরের মৃত্যু হয় গিলোটিনে। আর তারপরই রেইন অফ টেরর বা ভয়ের শাসনকাল শেষ হয়। দান্তোর শেষ কথার ভাষান্তর ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে (My only regret is that I am going before that rat Robespierre … don’t forget to show my head to the people. It’s well worth seeing.)

১১
আমাকে একটু সময় দিলে আমি সারা ভারতবাসীকে শিখিয়ে দিতাম কি করে বোমা বানাতে হয়।
ক্ষুদিরাম বসু (৩.১২.১৮৮৯ – ১১.৮.১৯০৮)। ভারতে বৃটিশ শাসন বিরোধী বিপ্লবী যোদ্ধা। ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম হয়েছিল পশ্চিম বাংলার মেদিনীপুরে হাবিবপুর গ্রামে। মৃত্যুর সময়ে তার বয়স ছিল ১৮ বছর ৭ মাস ১১ দিন। ৩০ এপৃল ১৯০৮-এ মুজাফফরপুর, বিহারে রাতে সাড়ে আটটায় ইওরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে তিনজনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয় ২১.৫.১৯০৮-এ। বিচারক ছিলেন জনৈক বৃটিশ মি. কর্নডফ এবং দুইজন ভারতীয়, লাথুনিপ্রসাদ ও জানকিপ্রসাদ। রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের মুখে হাসি দেখা যায়। তার বয়স খুব কম ছিল। বিচারক কর্নডফ তাকে প্রশ্ন করেন, তাকে যে ফাসিতে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে কিনা? ক্ষুদিরাম আবার মুচকে হাসলে বিচারক আবার প্রশ্নটি করেন। ক্ষুদিরাম তখন ওপরে উদ্ধৃত কথাটি বলেন। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ভোর ছয়টায়। ফাসির মঞ্চ ওঠার সময়ে তিনি হাসিখুশি ছিলেন। ক্ষুদিরামকে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা লিখেছিলেন এবং অনেক গানও তখন রচিত হয়েছিল। যেমন, একবার বিদায় দে মা। তার মৃত্যুর পর বৃটিশদের খুন করার জন্য তরুণরা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল।

১২
মৃত্যু কিছু না। জীবনও কিছু না। মরে যাওয়া, ঘুমিয়ে পড়া, শূন্য হয়ে যাওয়া – এসবে কি আসে যায়? সবই মায়া, মরীচিকা।
মাটা হারি (Mata Hari ১৮৭৬ – ১৯১৭)। ডাচ ডান্সার ও স্পাই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পক্ষে স্পাইংয়ের জন্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলিতে তার মৃত্যুর আগে একজন নান (Nun) তাকে সান্ত¦না দিতে গেলে মাটা হারি (৪১) এই কথাগুলো বলেছিলেন। তিনি তার চোখে কালো কাপড় বাধতে রাজি হননি। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি ফায়ারিং স্কোয়াডকে হাত নেড়ে ফ্লাইং কিস দিয়েছিলেন।

১৩
বন্ধুরা, একটু পরেই তোমার একটা ভাজা আপেল দেখবে।
জর্জ আপেল (George Appel? – ১৯২৮)। আমেরিকান খুনি। নিউ ইয়র্কের একজন পুলিশকে হত্যার দায়ে ১৯২৮-এ জর্জ আপেলকে ইলেকটৃক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

১৪
ব্যক্তিকে সহজেই হত্যা করা যায়, কিন্তু আদর্শকে হত্যা করা যায় না। বড় বড় সা¤্রাজ্য ভেঙে গুড়িয়ে গেছে  কিন্তু আদর্শ টিকে থেকেছে।
ভগত সিং (২৮.৯.১৯০৭ – ২৩.৩.১৯৩১)। ভারতে বৃটিশ শাসন বিরোধী পাঞ্জাবের মার্কসবাদী সোশালিস্ট ও নাস্তিক বিপ্লবী। পুলিশি হেফাজতে থাকার সময়ে লালা লাজপৎ রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধে বৃটিশ পুলিশ অফিসার জন সনডার্স-কে হত্যার অপরাধে ভগৎ সিংকে (২৩) মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। লাহোর জেলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তিনি বৃটিশ কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখে ফাসির বদলে একজন যোদ্ধা রূপে ফায়ারিং স্কোয়াডে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুরোধ করেছিলেন। সেই অনুরোধ উপেক্ষিত হয়েছিল। ইনডিয়ার পার্লামেন্ট ভবনের সামনে তার সম্মানার্থে একটি ব্রঞ্জ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে।

১৫
মৃত্যু আমার দরজায় এসে গিয়েছে। অনন্তের দিকে আমার মন উড়ে চলেছে … এত সুন্দর, এত কঠিন, এত পূতপবিত্র সময়ে আমি তোমাদের জন্য কি রেখে যাব? একটাই জিনিস। সেটা হচ্ছে আমার স্বপ্ন  মুক্ত ভারতের সোনালি স্বপ্ন। ১৮ এপৃল ১৯৩০ তারিখটি কখনোই ভুলে যেও না চট্টগ্রামে পূর্বঞ্চলীয় বিদ্রোহের দিনটি … ভারতের স্বাধীনতার জন্য যেসব দেশপ্রেমিক জীবন দিয়েছেন তাদের নামগুলো তোমার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে লিখে রেখ।
সূর্য সেন (পূর্ণ নাম সূর্যকুমার সেন যিনি মাস্টারদা নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন, (২২.৩.১৮৯৪ – ১২.৩.১৯৩৪)। চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের বিপ্লবী মহানায়ক। সূর্য সেনের জন্ম হয়েছিল নোয়াপাড়া, রাওজান, চট্টগ্রামে। নন্দনকাননে একটি স্কুলের টিচার সূর্য সেন যোগ দেন বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতি-তে। লক্ষ্য ছিল ভারতে বৃটিশ শাসনের অবসান। অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর জালালাবাদ পাহাড়ের কাছে তাকে ও তার দলকে ঘিরে ফেলে বৃটিশ বাহিনী। খণ্ডযুদ্ধে মারা যান বারোজন বিপ্লবী। কেউ আহত হন। কেউ ধরা পড়েন। সূর্য সেন পালিয়ে যেতে পারেন। ছদ্মবেশ ও ছদ্মপরিচয়ে (এমনকি মুসলিম পরিচয়েও)। সূর্য সেন কিছুদিন লুকিয়ে থাকার পর নেত্র সেন নামের এক ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়েন। সূর্য সেনকে টর্চার করা হয়। বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড হয়। চট্টগ্রাম জেলে সূর্য সেনের ফাসির মঞ্চ এখন বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত। তার নামে ঢাকায় একটি ছাত্রাবাস হয়েছে। বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেনকে হত্যা করে বিপ্লবীরা প্রতিশোধ নিয়েছিল। সূর্য সেন (৩৯) তার এক বন্ধুকে শেষ যে চিঠি লিখেছিলেন তার কয়েকটি লাইন ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে। তবে মূল বাংলা চিঠি না পাওয়ায় তার ইংরেজি অনুবাদের একটি ভাষান্তর প্রকাশিত হয়েছে।

১৬
কু-ত্তার বাচ্চারা, আমার মা-কে ভালোবাসা জানিয়ে দিস।
ফ্রান্সিস ক্রাউলি (Francis Crowley,? – ১৯৩৯)। আমেরিকান ডাকাত ও খুনি। ১৯৩৯-এ সিং সিং জেলখানায় ইলেকটৃক চেয়ারে বসে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি এই নির্দেশ দিয়েছিলেন।

১৭
আমি শুধু একটাই অনুরোধ করছি  আমাকে আমার কাজটা শেষ করতে দিন।
আইজ্যাক বেবেল (Isac Babel, ১৮৯৪ – ১৯৪১)। ছোট গল্প লেখক রাশিয়ান ইহুদি। গুপ্তচরবৃত্তি ও সন্ত্রাসের মিথ্যা অভিযোগে সভিয়েট সিক্রেট পুলিশ ১৯৩৯-এ তাকে গ্রেফতার করে। যে অসম্ভব অবিচারের দুঃস্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন সেটা ফ্রানজ কাফকা তার দি ট্রায়াল উপন্যাসে কল্পনা করেন। ১৯৪০-এ বেবেল (৪৪) বাধ্য হন একটা স্বীকারোক্তি দিতে। তার মৃত্যুদণ্ড হয়। গুলি করে তাকে হত্যার আগে এই ছিল তার শেষ কথা।

১৮
আর সোয়া ঘণ্টা পরে আমি মারা যাব। নিজের দেশের মানুষের হাতে মরাটা কঠিন। কিন্তু এই বাড়িটা ঘিরে রাখা হয়েছে। আর হিটলার দেশদ্রোহিতার অভিযোগ করেছেন আমার বিরুদ্ধে। জার্মানির জন্য আফৃকাতে আমি যেসব কাজ করেছি, তার স্বীকৃতি স্বরূপ আমাকে বিষ খেয়ে মরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে … সেটা যদি আমি করি তাহলে আমার পরিবারের কারো বিরুদ্ধে, অর্থাৎ, তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ওরা নেবে না। আমার কর্মচারিদের বিরুদ্ধেও কোনো শান্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে না।

আরউইন রোমেল (Erwin Rommel ১৮৯১ – ১৯৪৪)। জার্মান জেনারেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি হিটলারের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেন এবং তাকে হত্যার চক্রান্তে যোগ দেন। সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। রোমেল ধরা পড়েন। হিটলার তাকে দুটি বিকল্প দেন, ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যু অথবা বিষপানের আত্মহত্যা। রোমেল (৫২) দ্বিতীয় বিকল্পটি বেছে নিয়েছিলেন এবং বিষ খাওয়ার আগে এই কথাগুলো তার ছেলে ম্যানফ্রেড-কে বলেছিলেন।

১৯
আমার কাহিনী হচ্ছে একটি প্রেমের কাহিনী। কিন্তু এটা বুঝবে শুধু তারাই যারা প্রেমের ফলে নির্যাতিত হয়েছে। আমার সম্পর্কে বলা হয়েছিল আমি আবেগবিহীন মোটা নারী। হ্যা, আমি মোটা। কিন্তু সেটাই যদি অপরাধ হয়, তাহলে কয়জন নারীকে মোটা হওয়ার অপরাধে দোষী রায় দেওয়া হয়েছে? আমি আবেগবিহীন স্টুপিড নই। বোকাও নই। আমার শেষ কথা এবং শেষ চিন্তা হলো : যে নিষ্পাপ সে যেন প্রথম পাথরটি ছুড়ে মারে।
মার্থা বেক (Martha Beck, ৬.৫.১৯২০ – ৮.৩.১৯৫১)। আমেরিকার সিরিয়াল খুনি। স্থূলাঙ্গী নারী মার্থা বেক ও তার প্রেমিক রেমন্ড ফার্নান্ডেজ খুনের জন্য অভিযুক্ত হয়েছিল। ১৯৪৯-এ তাদের বিচার চলার সময়ে লোনলি হার্টস কিলার ((Lonely Hearts Killer)  নামে মামলাটি পরিচিত হয়। মার্থা (৩০) ও রেমন্ড (৩৬) ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দিয়ে লোনলি বা নিঃসঙ্গ নারীদের প্রলুব্ধ করে হত্যা করত। ১৯৫১- তে সিং সিং জেলখানায় মার্থা ও রেমন্ডের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২০
জার্মানি দীর্ঘজীবী হোক। আর্জেনটিনা দীর্ঘজীবী হোক। অস্টৃয়া দীর্ঘজীবী হোক। এই তিনটি দেশের সঙ্গে আমি সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিলাম এবং এটা আমি ভুলব না। আমার স্ত্রী, আমার পরিবার এবং আমার বন্ধুদের ভালোবাসা জানাচ্ছি। আমি রেডি। আমাদের আবার দেখা হবে। এটাই সবার নিয়তি। আমি ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রেখে মরছি।
অটো এডলফ আইখম্যান (Otto Adlof Eichman ১৯০৬ – ১৯৫২)। জার্মান নাৎসি লেফটেনান্ট কর্নেল। যুদ্ধ শেষের পরে বুয়েনস আইরেস, আর্জেন্টিনাতে পালিয়ে থাকেন। মোসাদ বাহিনী তাকে কিডন্যাপ করে ইসরেলে নিয়ে যায়। সেখানে বিচারে যুদ্ধ অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত হন। আইখম্যানের (৫৬) ফাসি কার্যকর করা হয় ৩১ মে ১৯৬১-তে। এখন পর্যন্ত এটাই ইসরেলে বেসামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একমাত্র ঘটনা।
২১
আমেরিকান ফ্যাসিজমের প্রথম ভিকটিম আমরা।
ইথেল রোজেনবার্গ (Ethel Rosenberg, ২৫.৯.১৯১৫ – ১৯.৬.১৯৫৩)। অভিনেত্রী ও গায়িকা।
এটম বোমা স্পাই রূপে অভিযুক্ত ও ইলেকটৃক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত হয়েছিলেন। অনেকের মতে তিনি ও তার স্বামী, তারা দুজনই নিরপরাধ ছিলেন। ১৯৫৩- তে ইথেলের (৩৭) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে নিয়ম অনুসারে তিনটি ইলেকটৃক শকের পরেও তার মৃত্যু হয় না। তখন ডাক্তাররা পরীক্ষা করে বোঝেন ইথেলের হার্ট বিট চলছে। এরপর তাকে আরো দুটি ইলেকটৃক শক দেওয়া হয় ইথেলের মাথা থেকে ধোয়া বের হয়। তিনি মারা যান।
২২
আমরা দুজনই নিরপরাধ। এটাই পূর্ণ সত্য। জীবন একটা অমূল্য সম্পদ। কিন্তু সেই সম্পদটাও রক্ষার জন্য এই সত্যটাকে অস্বীকার করা যাবে না। সত্য এড়িয়ে আমাদের জীবন কিনলেও আমরা সম্মান নিয়ে বেচে থাকতাম না।
জুলিয়াস রোজেনবার্গ (Julius Rosenberg, ১২.৫.১৯১৮ – ১৯.৬.১৯৫৩)। ইলেকটৃকাল ইনজিনিয়ার। এটম বোমা স্পাই রূপে অভিযুক্ত ও ইলেকটৃক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। একই অভিযোগে তার স্ত্রী ইথেলও দণ্ডিত হয়েছিলেন। জুলিয়াসের (৩৫) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১৯৫৩-তে। প্রথম শকেই জুলিয়াস মারা যান।

২৩
হ্যা, নিশ্চয়ই। আমি একটা বুলেটপ্রুফ ভেস্ট (গেঞ্জি) চাই।
জেমস ডাবলিউ রজার্স (James W. Rodgers – ১৯৬০)। আমেরিকান কৃমিনাল। ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুর আগে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তার শেষ অনুরোধটা কি?

২৪
আমি দেশের, জাতির ও ধর্মের বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য তাকে হত্যা করতে রাজি হয়েছিলাম।
তালদুয়ে সোমারায়া থিরো (১৯৯৫ – ১৯৬২)। বৌদ্ধ ভিক্ষু। ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৯-তে কলম্বোতে শ্রী লংকার প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দরনায়েক (৬০)- কে তার বাসভবনে গুলি করে হত্যার পর আদালতে ওপরের উক্তিটি করেন থিরো। বিচার প্রাপ্ত থিরোর ফাসি হয় ৭ জুলাই ১৯৬২-তে। মুমূর্ষ অবস্থায় বন্দরনায়েক অনুরোধ করেছিলেন থিরোকে ক্ষমা করে দিতে এবং কোনো প্রতিশোধ না নিতে। বন্দরনায়েকের মৃত্যুর নয় মাস পরে ২১ জুলাই ১৯৬০-এ তার স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক হন শ্রী লংকার এবং বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
২৫
আমি এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছি। আমি যেভাবে বেচে আছি তেমনভাবে আগে কখনোই বাচিনি। ঈমানের (প্রকৃত বিশ্বাসের) মানে আমি বুঝতে পারছি। আকিদাহর (প্রকৃত ইসলামি বিশ্বাসের) মানেও আমি বুঝতে পারছি… আমি শাহাদাতের জন্য অপেক্ষা করছি। এর চাইতে ভালোভবে আমি এর আগে আর কখনোই বাচিনি।
সাইয়িদ কুতুব (১৯০৬-১৯৬৬)। ইজিপ্টের ইসলামি তাত্ত্বিক, লেখক, কবি ও ইসলামি ব্রাদারহুড পার্টির অন্যতম নেতা। প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের চেষ্টা করেছিলেন তাকে নিজের পক্ষে টানতে। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হবার পরে একটি প্রহসনমূলক বিচারে কুতুবকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আদেশটি শোনার পরে কুতুবের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তিনি আদালতে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। আমি পনের বছর যাবৎ জেহাদ করে এই শাহাদত অর্জন করতে চলেছি। ফাসির সময়ে তার মুখে হাসি ছিল এবং তিনি হাত নেড়ে জেল গার্ডদের বিদায় জানান।
২৬
যা করে থাকি না কেন তার জন্য আমি গর্বিত। আমি ভীত নই। শেষে শুধু বলব, আমি আমার দেশ ও জাতিকে ভালোবাসি। এ জাতির প্রাণে আমি মিশে রয়েছি। কার সাহস আছে আমাদের আলাদা করবে? নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর কোনো বড় সম্পদ নেই। আমি তার অধিকারী। আমি আমার জাতিকে তা অর্জন করতে ডাক দিয়ে যাই।
আবু তাহের (১৪.১১.১৯৩৮ – ২১.৭.১৯৭৬)। মুক্তিযোদ্ধা ও কর্নেল। ১৯৭৫- এ সেনাবাহিনীতে সংঘটিত হত্যা ও দেশদ্রোহিতার অপরাধে ২৪ নভেম্বর ১৯৭৫- এ গ্রেফতার হন আবু তাহের। ২১ জুন ১৯৭৬-এ ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে তার বিচার শুরু হয়। বিচারের সময়ে আবু তাহের যে সুদীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছিলেন তার শেষাংশ ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে। ১৭ জুলাই তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয় এবং ২১ জুলাই ১৯৭৬ সেটি কার্যকর করা হয়।

২৭
ওই লোকটাকে আমি খুন করিনি। আমার আল্লাহ সেটা জানেন। আমি খুন করে থাকলে সেটা স্বীকার করার মতো সাহস আমার আছে। এখন যে বিপদ ও অপমানের মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হচ্ছে, তার চাইতে কম হতো ওই স্বীকারোক্তি করলে। কোনো আত্মমর্যাদা বোধ সম্পন্ন ব্যক্তি এই বর্বর বিচার সহ্য করতে পারেন না। আমি একজন মুসলিম। একজন মুসলিমের ভাগ্য নিয়ন্ত্রা আল্লাহ। আমি পরিষ্কার বিবেক নিয়ে তার সামনে দাড়াতে পারব। তাকে বলতে পারব একটা ধ্বংসস্তূপ থেকে আমি তার ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানকে পুনর্গঠিত করে একটা সম্মানজনক অবস্থায় উন্নীত করেছিলাম। কোট লাখপত- এর দুর্বিষহ স্থানে আমি আমার বিবেক নিয়ে পূর্ণ শান্তিতে আছি। মৃত্যুর জন্য আমি ভীত নই। তুমি দেখেছ আগুনের মধ্য দিয়ে আমি কিভাবে হেটে গিয়েছি।
জুলফিকার আলী ভুট্টো (৫.১.১৯২৮ – ৪.৪.১৯৭৯)। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৭-এ একটি সামরিক ক্যু-তে পদচ্যুত ও গ্রেফতার হন ভুট্টো। নতুন শাসক জেনারেল জিয়াউল হকের নির্দেশে ভুট্টোর বিচার হয় মার্চ ১৯৭৪-এ বিরোধী পলিটিশিয়ান আহমেদ রাজা কাসুরির পিতা আহমেদ খান কাসুরিকে গুলি করে হত্যার অপরাধে। হুকুমের আসামি রূপে ভুট্টোকে কাঠগড়ায় দাড়াতে হয়। তার প্রতিবাদ গ্রাহ্য হয় না। ফাসিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভুট্টো তার কন্যা বেনজিরকে যে শেষ চিঠি লিখেছিলেন তার কিছু অংশ ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে। কথিত আছে, ফাসির মঞ্চে যাওয়ার সময়ে ভুট্টো (৫১) খুব ভীত হয়েছিলেন। তার মৃত্যুর জন্য দায়ী জিয়াউল হক প্রেসিডেন্ট পদে থাকার সময় ১৯৮৪-তে একটি নাশকতামূলক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান।

২৮
মনে রেখ, আজ থেকে তুমি আমার সন্তানের মা-ই শুধু নও। তুমি তাদের পিতাও।
নওয়াজিশ উদ্দীন (? – ১৯৮১)। মুক্তিযোদ্ধা ও কর্নেল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার সময়ে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। সেপ্টেম্বর ১৯৮১-তে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তার স্ত্রীকে লেখা চিঠির অংশ।

২৯
প্রিয় বিশ্বাসী জনগণ, আমি তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। কিন্তু আমি থাকব পরম করুণাময় আল্লাহর সঙ্গে। তার কাছে যারা আশ্রয় চান তিনি তাদের সাহায্য করেন এবং কখনোই কোনো বিশ্বাসীকে নিরাশ করেন না … আল্লাহ মহান … আল্লাহ মহান … আমাদের জাতি দীর্ঘজীবী হোক … আমাদের সংগ্রামী জনগণ দীর্ঘজীবী হোক … ইরাক দীর্ঘজীবী হোক … প্যালেস্টাইন দীর্ঘজীবী হোক … জেহাদ ও মুজাহেদিন দীর্ঘজীবী হোক।
সাদ্দাম হোসেন (২৮.৪.১৯৩৭ – ৩০.১২.২০০৬)। ইরাকের প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ১৩ ডিসেম্বর ২০০৩-এ তিনি ধরা পড়েন। বিচারে তার ফাসিতে মৃত্যুদণ্ড হয়। ৩৯ বছর (ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪ – এপৃল ২০০৩) ক্ষমতায় থাকা কালে সাদ্দাম হোসেনের নির্দেশে বহু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল। সাদ্দামের পতন অনিবার্য ভেবে তার দুই জামাই সপরিবারে জর্ডানে পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাদ্দামের অনুরোধে এবং নিরাপত্তার আশ্বাসে তারা ফিরে এলে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। শ্বশুর সাদ্দামের নির্দেশে দুই জামাইয়ের ফাসি হয়েছিল। ইরাকে সাদ্দাম বিরোধী আমেরিকা অভিযাগের পর একটি ইরাকি আদালতে ১৯৮২-তে ১৪৮ ইরাকি শিয়া হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সাদ্দামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ফাসির মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মোবাইল ফোন ক্যামেরায় ধারণ করা সাদ্দামের (৬৯) ছবিতে তাকে অকুতোভয় ও দৃঢ়চেতা রূপে দেখা যায়। মৃত্যুর আগে সাদ্দাম তার উকিলকে শেষ যে চিঠি লিখেছিলেন তার কিছু অংশ ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে।

৩০
তওবা আমি নিজেই জানি। আমি জিন্দা পীরের আওলাদ। আপনারা জানেন না, আমার পূর্বপুরুষরা ইয়েমেন থেকে এসেছিলেন। আমি নিজেও একজন পীর। তবে কখনো পীরগিরি করতে যাইনি। মৃত্যুকে কখনো ভয় পাইনি … ওই যে ড্রেসটি দেখছেন, সেটি আমি আগেই ধুয়ে রেডি করে রেখেছি। নামাজও আমি আগেই পড়েছি … আমি জুতা পায়ে মঞ্চের দিকে যেতে চাই তবে মঞ্চে ওঠার আগে সেটা খুলে নেবেন।
সৈয়দ ফারুক রহমান (? – ২৭.০১.২০১০)। মুক্তিযোদ্ধা ও লেফটেনান্ট কর্নেল। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি চার আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার অভিযোগে দণ্ডিত ফারুক তার ফাসি কার্যকর হবার আগে জেলের পেশ ইমাম ও জেল কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এ উক্তিটি করেন।

৩১
রিভিউ পিটিশনের আগেই আপনারা ফাসির প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। আমি কিন্তু জেল কোড ভালো করেই জানি।
সুলতান শাহরিয়ার রশিদ (? – ২৭.০১.২০১০)। মুক্তিযোদ্ধা ও লেফটেনান্ট কর্নেল। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি চার আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার অভিযোগে দণ্ডিত সুলতান রশিদ তার ফাসি কার্যকর হবার আগে জেল কর্মকর্তাদের উদ্দেশে হাসিমুখে এই উক্তিটি করেন। এর আগে একটি শাদা কাগজে তিনি লেখেন, আমি একজন ফৃডম ফাইটার। এর সঙ্গে আমি জড়িত না। তাই নীতিগত কারণে রাষ্ট্রপতির কাছে আমি প্রাণভিক্ষা চাইতে পারি না।

৩২
আমাকে এই অবস্থানে ওঠানোর জন্য আল্লাহকে শত কোটি কৃতজ্ঞতা জানাই। সকল বিশ্বাসীকেও আমার অভিনন্দন জানাই। কারণ, আমরা সবাই একসঙ্গে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাড়িয়েছি এবং আমাদের শেষটাও হতেই হবে সত্য ও ন্যায়ের পথে। আমার পরিবারের প্রতি অনুরোধ, আমার মৃত্যুতে শোকার্ত না হয়ে তাদের উচিত হবে আমি যে অবস্থান অর্জন করেছি তাকে শ্রদ্ধা করা। আল্লাহ তোমাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকর্তা ও সাহায্যদাতা। আল্লাহ হাফেজ।
আফজাল গুরু (১৯৬৯ – ৯.২.২০১৩)। কাশ্মিরে জন্ম হওয়া ইনডিয়ান ব্যবসায়ী যিনি কাশ্মিরিদের স্বাধিকারের পক্ষে ছিলেন। ২০০১-এ ইনডিয়ান পার্লামেন্ট ভবনে সন্ত্রাসী হামলায় সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে ওই বছরেই গ্রেফতার হন। ১২ বছর সলিটারি কনফাইনমেন্টে তাকে রাখা পর ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩-তে আফজাল গুরুর (৪৩) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় দিল্লির তিহার জেলে। মৃত্যুর আগে তার পরিবাবের কাছে ১০ লাইনের শেষ চিঠির শেষাংশ ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে।

৩৩
মৃত্যুবরণকারীদের আল্লাহর কাছে অতি উচ্চ মর্যাদার কাথা আল্লাহ স্বয়ং উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ নিজেই যদি আমাকে জান্নাতের মর্যাদার আসনে বসাতে চান তাহলে আমার এমন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। কারণ জালেমের হাতে অন্যায়ভাবে মৃত্যু তো জান্নাতের কনফার্মড টিকেট … যদি সম্ভব হয় তাহলে মহল্লার মসজিদে এবং বাড়িতে জানাজার ব্যবস্থা করবে। পদ্মার ওপারের জেলাগুলোর লোকেরা যদি জানাজার শরিক হতে চায়, তাহলে আমাদের বাড়ির এলাকায় যেন আসে। তাদের অবশ্যই খবর দেওয়া দরকার … কবরের ব্যাপারে তো আগেই বলেছি, আমার মায়ের পায়ের কাছে। কোনো জৌলুসপূর্ণ অনুষ্ঠান বা কবর বাধানোর মতো বেদআত যেন না করা হয়। সাধ্য অনুযায়ী ইয়াতিমখানায় কিছু দান খয়রাত করবে। ইসলামি আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। বিশেষ করে আমার গ্রেফতার এবং রায়ের কারণে যারা শহীদ হয়েছে, অভাবগ্রস্ত হলে ওই সব পরিবারকে সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতে হবে …
পেয়ারী, হে পেয়ারী,
তোমাদের এবং ছেলেমেয়ের অনেক হকই আদায় করতে পারিনি। আল্লাহর কাছে পুরস্কারের আশায় আমাকে মাফ করে দিও। তোমাদের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করেছি। ইনশাআল্লাহ, জান্নাতের সিড়িতে দেখা হবে …
আবদুল কাদের মোল্লা (২.১২.১৯৪৮ – ১২.১২.২০১৩)। জামায়াতে ইসলামী নেতা। ১৯৭১-এ যুদ্ধ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচারে প্রথমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। পরে প্রচলিত আইন বদলিয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারকালে তিনি দাবি করেছিলেন একই এলাকায় বসবাসকারী জনৈক কসাই কাদেরের সঙ্গে তার পরিচয় গুলিয়ে ফেলা হয়েছে এবং তিনি (কাদের মোল্লা) নির্দোষ। স্ত্রীকে লেখা তার শেষ চিঠির কিছু অংশ ওপরে উদ্ধৃত হয়েছে। প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে তিনি রাজি হননি। ১২ ডিসেম্বর ২০১৩ ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কাদের মোল্লার ফাসি হয়।

অপরাধী এবং নিরপরাধী উভয় ধরনের দণ্ডিত ব্যক্তিদের শেষ কথাগুলো থেকে আমরা যারা জীবিত আছি, তারা গভীরভাবে বিবেচনা করতে পারি, মৃত্যুদণ্ডের কার্যকারিতা ও তাতপর্য কি?
জীবনের অধিকার, রাইট টু লাইফ (Right to life)  মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। আমরা বিবেচনা করতে পারি, মানুষের এই মৌলিক অধিকার হরণের ক্ষমতা রাষ্ট্রের থাকা উচিত কিনা?
আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি, সভ্য দেশ হলে রাষ্ট্র কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া রহিত করতেই হবে।
মধ্যম আয়ের দেশ না হতে পারলেও, বাংলাদেশ যেন মধ্যম সভ্যতার দেশ হতে পারে, সেই লক্ষ্যে আমরা সবাই কাজ করতে পারি।
এ দেশের মাটি একদিন কথা বলবে।
ফিরোজা মহসীন (মুক্তিযোদ্ধা বৃগেডিয়ার মহসীনউদ্দিন আহমেদ, যিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার সময়ে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন, তার স্ত্রী)।
সূচনা ১০ মে ২০১৪
সমাপ্ত ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪
Design by MS Design

Powered by Blogger